বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে মজবুত দেয়াল দিয়ে রক্ষা করার দায়িত্ব বিচারকদের, আইনজীবীদের এবং রাষ্ট্রের প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিকের। সবাই সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সর্বনাশা দিনের জন্য প্রতিটি নাগরিকের অপেক্ষা করতে হবে। রাজনৈতিক বিভক্তি রাজপথ অতিক্রম করে বিচারালয় অভিমুখে ধাবিত হলে সেটা বিচারালয়ের জন্য মঙ্গলজনক হয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইনজীবীদের বিভক্তি ও মতভেদ এবং তার প্রতিক্রিয়া বিচারালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাজনৈতিক মতাদর্শ রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করলে এবং বিচারালয়কে নিরাপদ দূরত্বে রাখলে বিচার বিভাগ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।’
দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ কর্মদিবসে আয়োজিত এক বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি এই মন্তব্য করেন।
বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি অবসরে যাচ্ছেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের শরৎকালীন অবকাশ (ছুটি) শুরু হওয়ায় বিচারপতি হিসেবে আজই ছিল তার শেষ কর্মদিবস। এরপর তাকে আর এজলাস কক্ষে বসতে দেখা যাবে না। এ উপলক্ষে রেওয়াজ অনুযায়ী সকাল সাড়ে ১০টায় তাকে দেওয়া হয় বিদায় সংবর্ধনা। সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাস কক্ষে এই বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষে সভাপতি মমতাজ উদ্দিন ফকির ও সম্পাদক আব্দুন নূর দুলাল এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষে থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন প্রধান বিচারপতির প্রশংসা তুলে ধরে বিদায় সংবর্ধনা জানান। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতি এবং আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবর্ধনার জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগ জনগণের মৌলিক অধিকারের রক্ষক। সংবিধানের রক্ষক। তাই বিচারকদের সাহসী ও সুবিচারক হতে হবে। বিচার বিভাগ যদি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ বা পিছপা হয় তাহলে রাষ্ট্র এবং নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ, আইনের শাসন সংরক্ষণ এবং সমাজের দুর্বল অংশের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য। বিচারকদের উদ্দেশে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি বিচারকদের বলব সাহসী, উদার, ধৈর্যশীল এবং চিন্তাশীল হতে এবং হতে হবে উদ্যমী, দয়ালু, প্রজ্ঞাবান, সুবিচার করার দৃঢ় প্রত্যয়। বিচারিক আদেশ আমাদের হৃদয় পরিবর্তন করতে পারে না, কিন্তু হৃদয়হীনতাকে সংযত করতে পারে। আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, চেষ্টা করেছি আপনাদের শুনে, বুঝে, বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার। আমি চেষ্টা করেছি ধৈর্যসহকারে শোনার, যত্নসহকারে বিবেচনা করার, সঠিকভাবে বোঝার এবং ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত দেওয়ার। একজন রাজনীতিবিদ পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন, একজন রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন আর একজন বিচারককে ভাবতে হবে সংবিধান ও আইনানুযায়ী ন্যায়বিচার করার কথা।
স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণ রেখে বিচার পরিচালনার আহ্বান জানিয়ে দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবিধানপ্রণেতারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করেছেন-সে স্বাধীনতা কার্যকর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের এবং প্রতিটি নাগরিকের। সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ’৭১-এর রক্ত বৃথা যাবে। তিনি বলেন, আইন যদি দরিদ্রকে পিষে দেয় আর ধনী ব্যক্তি যদি আইনকে পিষে দেয় তাহলে রাষ্ট্র এবং বিচার বিভাগ সঠিকভাবে চলছে এটা কোনোভাবেই বলা যাবে না। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য।
শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আমি জুনিয়র আইনজীবীদের বলব, তোমরা পরিশ্রমী ও শক্তিশালী হও কিন্তু ভদ্রতাকে বিসর্জন দিয়ে নয়, দয়ালু হও কিন্তু দুর্বল নয়, সাহসী হও কিন্তু আদালতকে ধমকাবে না, চিন্তাশীল হও কিন্তু অলস হয়ো না, নম্র হও কিন্তু ভীরু হয়ো না, গর্বিত হও কিন্তু অহংকারী নয়, হাস্যরসিক হও কিন্তু মূর্খতা ছাড়া। সৎ থাকো, পরিশ্রম করো, একদিন দেখবে অনেক বড় আইনজীবী হয়ে গেছ। মহাকাশের মতো উদার হও যেখানে কোনো জাতীয় সংঘাত নেই।
প্রধান বিচারপতি আইনজীবী-বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, আমার মনে হয় আমার উত্তরাধিকারী গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবেন এবং আমি এটাও মনে করি মহান আল্লাহতায়ালা তাকে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার অধিকারী করবেন। বিচার বিভাগকে আরও গতিশীল বিচার বিভাগে পরিণত করবেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি আমার বিচার বিভাগ তার কাছেই হস্তান্তর করতে যাচ্ছি যিনি এই বিভাগকে আরও গতিশীল করার জন্য ক্ষমতাবান এবং মনোযোগী হবেন। আমি অপেক্ষা করব আপনাদের ভবিষ্যতের সাফল্যের গল্প শোনার জন্য। এখানে আমার ৪৩ বছরের পদচারণা আজ থেকে স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমি মহান আল্লাহ-রাব্বুল আলামিনের মহাশক্তিতে বিশ্বাস করি, তিনি এই পবিত্র বিচারালয়, বিজ্ঞ বিচারক, বিজ্ঞ আইনজীবী, বিচারালয়ের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে রক্ষা ও সঠিক পথে চলার তওফিক দান করবেন।
বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ১৯৫৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পড়ালেখা শেষে ১৯৮১ সালের ২১ আগস্ট জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তিনি ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এবং ১৯৯৯ সালের ২৭ মে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, খুলনা সিটি করপোরেশন, কুষ্টিয়া পৌরসভা, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির আইন উপদেষ্টা ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলও।
২০০৯ সালের ২৫ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ আপিল বিভাগে নিয়োগ পান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এ ছাড়া তিনি ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বড় ভাই বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ১৯৮০ সালের ২৩ এপ্রিল মুন্সেফ হিসেবে বিচার বিভাগের নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে জেলা ও দায়রা জজ হন। ২০০৯ সালের ৩০ জুন হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী নিয়োগ পান। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর তিনি আপিল বিভাগে নিয়োগ পান। ২০২১ সালে ১৫ জুলাই অবসরে যান তিনি। এরপর বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী আইন কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান।
মন্তব্য করুন