

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। এই গণভোটে একটি সংস্কার সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ অথবা বিপক্ষে ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধান, সংসদ, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে জানিয়েছে সরকার।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং ৩৭টি আইন, অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। সরকার বলছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।
ভাষা ও জাতীয় পরিচয়ে পরিবর্তন
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এলে সংবিধানে বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতি যুক্ত হবে। নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে নির্ধারিত হবে। সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে যুক্ত হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
বর্তমানে সংবিধানে থাকা ২২টি মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত হবে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার। সংবিধান বাতিলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
জুলাই সনদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে এবং সেই বৈঠকে বিরোধী দলের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। জরুরি অবস্থার সময়ও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে অধিষ্ঠিত থাকার সুযোগও বাতিল করা হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে।
সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে। জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য থাকবেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সেখানে আসন বণ্টন করা হবে।
নারীদের সংরক্ষিত আসন ধাপে ধাপে ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব রয়েছে। সংসদের ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দলের সদস্য। বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের ভূমিকা বাড়ানো হবে। বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি বিভাগভিত্তিক হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
ন্যায়পাল, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন গঠনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটি যুক্ত হবে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন এবং কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।
উল্লেখ্য, গণভোটের ব্যালটে এসব বিস্তারিত বিষয় উল্লেখ থাকবে না। সেখানে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ের ভিত্তিতে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট।
মন্তব্য করুন