সাইফুল্লাহ হায়দার
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:২৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

রাজনীতি কি একটি পেশা?

সাইফুল্লাহ হায়দার। ছবি : সৌজন্য
সাইফুল্লাহ হায়দার। ছবি : সৌজন্য

বর্তমান সময়ে রাজনীতি এবং পেশা, এ দুটি শব্দ যখন একসাথে উচ্চারিত হয়, তখন আমাদের অনেকের কাছে প্রশ্ন ওঠে: রাজনীতি কি আদৌ একটি পেশা হতে পারে? প্রশ্নটি সঙ্গত, কারণ যখন আমরা রাজনীতি শব্দটির সাথে পরিচিত হই, তখন মনে হয়, এটি শুধু জনগণের সেবা, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের ফলস্বরূপ। কিন্তু দিন দিন রাজনীতি একটি পেশার রূপ নিতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন কিভাবে ঘটছে এবং এর প্রভাব কী হতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

রাজনীতি এবং পেশার পার্থক্য

প্রাচীনকালে রাজনীতি ছিল একটি ব্রত, একটি মহৎ উদ্দেশ্য যেখানে জনগণের সেবা এবং দেশপ্রেম ছিল প্রধান লক্ষ্য। তখনকার রাজনীতিবিদরা নিজেকে দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করতেন এবং তাদের জীবনে কোনো ব্যক্তিগত লাভের আশা ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা, দেশের উন্নয়ন, এবং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজনীতির সংজ্ঞা বদলে গেছে।

বিশ্বের অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো রাজনীতির সংজ্ঞাও পরিবর্তিত হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকেও অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের কোনো নির্দিষ্ট পেশা ছিল না। তারা শুধুমাত্র রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের সেবা করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু আজকাল দেখা যায়, রাজনীতির সাথে অনেক নেতাই ব্যবসা বা অন্যান্য পেশায় যুক্ত হয়ে আছেন। তারা ভোটের রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনীতি করছেন, যা রাজনীতি ও পেশার মধ্যে সীমারেখা একেবারে মুছে দিয়েছে।

ম্যাক্স ওয়েবারের দৃষ্টিকোণ

বিখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে এক বক্তৃতায় রাজনীতির অর্থে নতুন এক দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করেছিলেন। ওয়েবার বলেছিলেন, ‘রাজনীতি একটি পেশা’।

তার মতে, রাজনীতিবিদরা শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য বা জনপ্রিয়তার জন্য রাজনীতি করেন না। তাদের নৈতিক মেরুদণ্ড থাকা উচিত এবং তারা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। ওয়েবারের দৃষ্টিকোণ থেকে, রাজনীতির উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ এবং সমাজের উন্নতি হওয়া উচিত, নয়তো তা হবে কেবল ক্ষমতার লোভ।

এছাড়াও, ওয়েবার বলেছেন, একজন রাজনীতিবিদ শুধুমাত্র ভোট পাওয়ার জন্য অযৌক্তিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন না। তাদের কার্যক্রমের উদ্দেশ্য থাকা উচিত এবং তারা যখন ইতিহাসের পরিবর্তনের দিকে এগোবেন, তখন তাদের কাছে হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব এবং বিচার করার ক্ষমতা। কিন্তু আজকের রাজনীতিতে অনেকেই শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেন, যা বেশিরভাগ সময় বাস্তবে রূপ নেয় না।

১৯৭১ থেকে ২০১৮ : রাজনীতিতে পেশাদারিত্বের পরিবর্তন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে রাজনীতিতে পেশাদারিত্বের পরিবর্তন হতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৩১ শতাংশ ছিলেন আইনজীবী, ১৮ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী, এবং কৃষক পরিবারের সদস্যরা ছিল ১১ শতাংশ। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে ৩১ শতাংশ আইনজীবী কমে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, এবং ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ শতাংশ হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে রাজনীতির পেশার পরিবর্তন ঘটেছে এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রভাব অনেক বেড়ে গেছে।

এছাড়া, ২০২৩ সালের নির্বাচনে আরও ভয়াবহ পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে, যেখানে ব্যবসায়ী এবং মাফিয়া শ্রেণির সদস্যদের আধিক্য দেখা গেছে। তাদের এই প্রভাব দেশের রাজনীতির চেহারা বদলে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রাজনীতি এখন শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্জনের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক নেতা এখন ব্যবসা বা অন্যান্য পেশা নিয়েই রাজনীতি করছেন, যার ফলে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য দেশ ও জনগণের সেবা থেকে সরে গিয়ে তা ব্যক্তিগত লাভের দিকে চলে গেছে।

নবীন রাজনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি

এখনকার রাজনীতির চিত্র আরও জটিল। পেশাগতভাবে যারা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ব্যবসায়ী। তারা পেশার মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করেন, সেটি রাজনীতির জন্যও কাজে লাগান। এই পরিস্থিতি একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার অভাব বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যারা রাজনীতির মাধ্যমে প্রকৃত জনগণের সেবা করতে চান, তাদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ অনেক বড়।

এখনকার রাজনীতিতে যদি পেশা এবং উপার্জনকে আলাদা করা না যায়, তবে একদিন হয়তো রাজনৈতিক দলের নেতারা শুধুমাত্র টিকিট পাওয়ার জন্যই রাজনীতিতে প্রবেশ করবেন, এবং জনগণের সেবা বা উন্নতি হবে না। এই পরিস্থিতি সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।

রাজনীতি যদি একটি পেশা হয়ে যায়, তবে তার সঙ্গে সম্পর্কিত দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বও পাল্টে যাবে। আর্থিক লাভের জন্য যারা রাজনীতি করছেন, তাদের কাছে জনগণের সেবা একটি নৈতিক দায়িত্বের চেয়ে ব্যবসায়িক চুক্তির মতো হয়ে দাঁড়াবে। এটি দেশের রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, যদি নতুন প্রজন্মের নেতারা বৈধভাবে উপার্জন করে এবং তাদের উদ্দেশ্য থাকে জনগণের সেবা, তবে সেই রাজনীতি সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে।

লেখক: সাইফুল্লাহ হায়দার, কেন্দ্রীয় সংগঠক জাতীয় নাগরিক কমিটি।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাদকবিরোধী অভিযানের সময় হ্যান্ডকাপ পরা মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনতাই

ভোটের আগে ও পরে সরকারের কথায় মিল পাচ্ছি না : মজিবুর রহমান মঞ্জু

আড়াইহাজারে ডাকাতের হামলায় এসিল্যান্ডসহ আহত ৬

বাংলাদেশি ব্রাজিল প্রেমীদের সাড়া দিলেন নেইমার

শেষ মুহূর্তের গোলে নকআউট পর্বে জার্মানি

এনসিপির এমপিদের ৬ জনই শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিল : আব্দুল্লাহ হিল বাকী

অবশেষে ১-১ গোলে সমতায় ফিরল জার্মানি

অফসাইড নয়, যে কারণে বাতিল হলো জার্মানির গোল

স্কটল্যান্ড ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে দুঃসংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিলেন ফুলবাড়িয়ার মিতুল

১০

প্রথমার্ধে জার্মানির বিপক্ষে ১-০ গোলে এগিয়ে আইভোরি কোস্ট

১১

বিশ্বকাপে পরের ম্যাচেই যে ৩ রেকর্ড ভাঙতে পারেন মেসি

১২

৬৮ বছর পর যে রেকর্ড দেখল ২০২৬ বিশ্বকাপ

১৩

ছাত্রশক্তিকে শিবিরশক্তিতে রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু : আব্দুল কাদের

১৪

নজর কাড়ছেন নেইমার সঙ্গী ব্রুনা বিয়ানকার্দি

১৫

মুখ ঢেকে কথা বলার খেসারত, দেখলেন বিশ্বকাপে প্রথমবার লাল কার্ড

১৬

৭২ বছরেও অক্ষত বিশ্বকাপের যে রেকর্ড

১৭

সুইডেনকে উড়িয়ে গ্রুপের শীর্ষে নেদারল্যান্ডস

১৮

হরমুজ বন্ধের ঘোষণায় লেবাননে হামলা বন্ধের নির্দেশ নেতানিয়াহুর

১৯

তিনটি ইউনিয়নেরই নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২০
X