

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে গুলি করে হত্যার দায়ে ৪৫ বছর বয়সী তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। হত্যাকাণ্ডের সাড়ে তিন বছর পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) এই রায় ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের খবরে বলা হয়েছে, জাপানের নারা ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক শিনিচি তানাকা রায় ঘোষণার সময় ঘটনাটিকে জঘন্য আখ্যা দেন। তিনি বলেন, বড় জনসমাবেশে বন্দুক ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নৃশংস অপরাধ।
২০২২ সালের জুলাই পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর নারায় নির্বাচনী প্রচারণায় ভাষণ দেওয়ার সময় ঘরে তৈরি বন্দুক দিয়ে শিনজো আবেকে গুলি করেন ইয়ামাগামি। ঘটনাস্থলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন আবের বয়স ছিল ৬৭ বছর। তিনি জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী।
গত অক্টোবরে মামলার প্রথম শুনানিতেই ইয়ামাগামি হত্যার কথা স্বীকার করেন। ফলে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়া নিশ্চিত হলেও সাজা কতটা কঠোর হবে, তা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে।
সরকারি কৌঁসুলিরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়ে বলেন, এই হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত গুরুতর এবং যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ সাজার মেয়াদ কমানোর আবেদন জানিয়ে ২০ বছরের বেশি কারাদণ্ড না দেওয়ার অনুরোধ করে। তাদের যুক্তি ছিল, ইউনিফিকেশন চার্চকে ঘিরে পারিবারিক সমস্যাই হামলার পেছনে মূল কারণ।
যদিও হামলার সময় শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তবে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। তার মৃত্যুর পর দলটির ভেতরে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। এর পর থেকে দুবার নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়ে প্রধানমন্ত্রী পদেও।
দুই দফায় মোট ৩ হাজার ১৮৮ দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আবে। অসুস্থতার কথা বলে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সানায়ে তাকাইচি জাপান ও এলডিপির নেতৃত্বে থাকলেও দলটির রাজনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আবে হত্যাকাণ্ডের পর এলডিপি ও ইউনিফিকেশন চার্চের মধ্যকার সম্পর্কও আলোচনায় আসে। দলটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা যায়, এই ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে শতাধিক আইনপ্রণেতার যোগাযোগ ছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর অনেক ভোটার এলডিপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
আদালতে ইয়ামাগামি জানান, তার মা ইউনিফিকেশন চার্চে বিপুল অনুদান দেওয়ায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। এ থেকেই তার মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা শেষ পর্যন্ত আবের বিরুদ্ধে সহিংসতায় রূপ নেয়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আবে একবার ইউনিফিকেশন চার্চ-সম্পর্কিত একটি অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইউনিফিকেশন চার্চ গণবিয়ের জন্য পরিচিত। জাপানি অনুসারীদের অনুদান সংগঠনটির আয়ের বড় উৎস।
দেশীয় রাজনীতিতে শিনজো আবে বিতর্কিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর তিনিই প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে একাধিকবার একসঙ্গে গলফ খেলেছেন তারা, যা দুই নেতার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
মন্তব্য করুন