রহমান মৃধা
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

কোটার ভিত্তিতে নয়, দেশ চলবে মেধার ভিত্তিতে

রহমান মৃধা। ছবি : সংগৃহীত
রহমান মৃধা। ছবি : সংগৃহীত

গণঅভ্যুত্থানের মূল কথা ছিল, কোটা নয়,মেধাভিত্তিক দেশ চাই। এখানে আমার প্রশ্ন, আমরা যদি সেই অতীতের মতোই থাকবো, তাহলে কী দরকার ছিল এত মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার?

এই আন্দোলন কি শুধু মুখ বদলের জন্য ছিল, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর জন্য। যদি চরিত্র না বদলায়, তাহলে এই রক্তের দায় কে নেবে। অন্তর্বর্তী সরকারের একমাত্র কাজ ছিল সংস্কার করা। কিন্তু তারা সেই কাজ ঠিকমতো করতে পারেনি। হয়তো বলা হবে, তাদের করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তখন তাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। হয় সেই সংস্কার আদায় করা, নয়তো সরে যাওয়া। তারা দুটোর একটিও করেনি। রাজনীতি কেবল উত্তরাধিকার বা তেলবাজির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য নয়। বিকল্প চিন্তা সম্ভব। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বিকল্প সৎভাবে দেখতে চাই, নাকি পুরোনো ধারণা আঁকড়ে ধরে প্রতিটি নতুন সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করবো।

পরিবর্তন কখনো শূন্য থেকে জন্মায় না। পরিবর্তন আসে তখনই, যখন একটি সমাজ নিজের ভুলগুলো চিনতে শেখে এবং সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া বন্ধ করে। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কোনো একক দল বা ব্যক্তির নয়। সংকট হলো আমাদের সম্মিলিত অভ্যাসের। প্রশ্ন না করার অভ্যাস, তেল দেওয়ার অভ্যাস, আর ভুল দেখেও চুপ করে থাকার অভ্যাস।

তাই আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন অভ্যাস। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অভ্যাস, যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার অভ্যাস, আর নীরবতা ভাঙার সাহস। এই অভ্যাস যদি আমরা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা হবে না। সেটি হবে ধীরে ধীরে, বাস্তবতার ভেতর দিয়েই। আর সেখান থেকেই হয়তো একদিন আমরা বলতে পারবো, এই দেশ শুধু মুখ বদলায়নি, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শিখেছে।

এই জায়গা থেকে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে; আমরা কি আবার কেবল আশা নিয়ে থেমে যাব, নাকি সেই আশাকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবো।

পরিশেষে একটি প্রস্তাব রাখতে চাই। আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি বাধ্যতামূলক ও নিরপেক্ষ ডিবেট ফোরাম চালু করা হোক, সরাসরি টেলিভিশনের পর্দায়। যেখানে সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা একসঙ্গে উপস্থিত থাকবেন এবং জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে জানাবেন, তারা দেশ কীভাবে চালাতে চান।

সুইডেনে নির্বাচন বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে এ ধরনের ডিবেট ফোরাম একটি শক্ত সংস্কৃতি। সকল রাজনৈতিক দল একই মঞ্চে বসে, সরাসরি সম্প্রচারে অংশ নেয়। দুজন স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাংবাদিক পুরো আলোচনা পরিচালনা করেন। এখানে স্লোগান নয়, প্রশ্ন থাকে। আবেগ নয়, পরিকল্পনা থাকে। জনগণের সামনে দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই প্রক্রিয়াটি শুধু বিতর্ক নয়। এটি একটি প্রকাশ্য অঙ্গীকার। একই সময়, একই মঞ্চে, জাতির সামনে প্রতিটি দলের অবস্থান পরিষ্কার হয়। মিথ্যা লুকানোর জায়গা থাকে না। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

বাংলাদেশের মতো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও জবাবদিহিবিহীন একটি দেশের জন্য এই সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়। এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত। গত পঞ্চান্ন বছরে সবাই যার যার জায়গা থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু ফলাফল দেখেছে দেশ। এই চক্র থেকে মুক্তি চায় জাতি।

তাই এখানে একটি স্পষ্ট করণীয় তালিকা থাকা জরুরি।

১. জাতীয় টেলিভিশনে সকল রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক সরাসরি অংশগ্রহণ ২. স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকের তত্ত্বাবধানে প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা ৩. দেশ গঠন ও উন্নয়ন বিষয়ে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য পরিকল্পনা উপস্থাপন ৪. একই সময়, একই মঞ্চে সব দলের বক্তব্য জনগণের সামনে আনা ৫. দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো নথিভুক্ত করে ভবিষ্যতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা ৬. জনগণের সামনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাধ্যতামূলক করা

যদি জনগণের সামনে সত্য, পরিকল্পনা এবং দায়বদ্ধতা প্রকাশ না করা হয়, তাহলে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার হাতবদল দেখবে, চরিত্রের পরিবর্তন নয়।

আর যদি এই সংস্কৃতিটি চালু করা যায়, তাহলে হয়তো একদিন আমরা বলতে পারবো, এই দেশ শুধু মুখ বদলায়নি, রাষ্ট্রচিন্তাও বদলাতে শুরু করেছে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

কালবেলা/এমএ
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে বিএনপি কর্মীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা

আরএফএল কর্মীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার, সহকর্মী পলাতক

অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা, হাঙ্গেরিতে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু

নতুন বাংলাদেশ গড়তে এনসিপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: হাসনাত আব্দুল্লাহ

‘রাজনৈতিক বিভেদের ঊর্ধ্বে থেকে আইনজীবীদের কল্যাণে কাজ করতে হবে’

বিশ্বকাপ ফাইনালের মারামারিতে যে শাস্তি পেতে পারেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়তে চান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট, দাবি ট্রাম্পের

হুতিদের হুমকির মুখে লোহিত সাগর থেকে ফিরে গেল ২ সৌদি জাহাজ

চুক্তি আগস্টে / এবার এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে সরকার

উন্নয়ন কোনো দলের নয়, জনগণের অধিকার: মান্নান

১০

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাদের প্রার্থী হতে সুযোগ দেবে না ইসি

১১

কুয়াকাটায় বসতবাড়ি থেকে পদ্ম গোখরা উদ্ধার

১২

ইরানে হামলা না চালালে আজ ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকত না: ট্রাম্প

১৩

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের খাদ্য সহায়তা

১৪

স্কালোনির পর আর্জেন্টিনার কোচ হতে পারেন যারা, আলোচনায় ৪ নাম

১৫

পাঁচ তারকা বিচারক নিয়ে শুরু হচ্ছে ‘ভয়েজ অব বাংলাদেশ’

১৬

টুঙ্গিপাড়ার পাশে সমাবেশ করে গেলেন হাসনাতরা

১৭

রাহুলকে কোথায় নেওয়া হয়েছে জানাচ্ছে না দিল্লি পুলিশ: কংগ্রেস

১৮

কসমেটিক সার্জারি করে নতুন লুকে ভিনি

১৯

একাধিক স্থানে অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীর সঙ্গে এমপি নজরুলের ভিডিও আছে, দাবি ড্রাইভারের

২০
X