

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। শহর থেকে গ্রামে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড নামক একটা বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। এটি বিএনপির নির্বাচনী একটি অঙ্গীকার। নির্বাচনে জয়ী হলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশ গড়ার পরিকল্পনার অন্যতম একটি পরিকল্পনা হলো ফ্যামিলি কার্ড যা দল মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের মা-বোনেদের হাতে দেওয়া হবে। বাংলাদেশে ৪ কোটি পরিবার আছে যার মধ্যে ৭০ শতাংশ গ্রামে ও ৩০ শতাংশ শহরে বসবাস করেন।
তারেক রহমান তার পডকাস্টে এ কথা উল্লেখ করে বলেছেন, প্রথমে গ্রাম থেকে শুরু করা হবে পাশাপাশি শহর থেকে নেওয়া হবে যারা দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত এমন শ্রেণি থেকে, এমনকি এই কার্ড পৌঁছাবে স্বচ্ছল পরিবারেও। এভাবে দেশের ৪ কোটি পরিবারের গৃহিণীর কাছে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পৌঁছাবে।
এই কার্ডে কী থাকবে এর ব্যাখ্যা দিয়ে তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করে লাখো মানুষের সামনে বলছেন, এই কার্ডে নগদ দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা অথবা ৫ জনের পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে গৃহিণীদের কাছে।
এই পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। সরকারের পক্ষ থেকে এমন সুবিধা মা-বোনেরা পেলে গ্রামীণ ও শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের অর্থের হিসাবে, এই দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা একটা রুরাল বা আরবান অঞ্চলের পরিবারের ৩০-৫০ শতাংশ বাজার ব্যয় পূরণ করার সামর্থ রাখে। পাশাপাশি এই অর্থ বিনিয়োগ করে গৃহিণীরা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। দিনশেষে যা নিজের পরিবারের কল্যাণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় হতে পারে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার। নারী পুরুষের অনুপাত ১০০:৯৬.৩ অর্থাৎ দেশে পুরুষের তুলনায় নারী বেশি। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে নারীদের অংশগ্রহণ, নারীদের ক্ষমতায়ন, নারীদের স্বাবলম্বী করার বিষয়ে নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই সমীক্ষায় উঠে এসেছে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ। এরমধ্যে চরম দারিদ্র্যে বাস করেন ৫.৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ দেশের ৫ ভাগের প্রায় ১ ভাগ মানুষ দরিদ্র। দেশের এত দরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা বলয় থাকে তন্মধ্যে এই ফ্যামিলি কার্ড আশার আলোর মতো কাজ করবে।
একইভাবে, ফ্যামিলি কার্ড কেবল দরিদ্র শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্বচ্ছল পরিবারের গৃহিণীদের জন্যও প্রযোজ্য হবে বলে বিএনপির চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে জানিয়েছেন। এর মানে, যে কোনো অবস্থান থেকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যেন দেশের মা-বোনেরা স্বাবলম্বী হন, পরিবারে তাদের গুরুত্ব বেড়ে উঠুক এমন পরিকল্পনাই ফ্যামিলি কার্ড।
এবার আলোচ্য বিষয় হলো এই কার্ডের চ্যালেঞ্জ। যা নির্ধারণ করবে এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ার ইতিহাস আছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি হলো প্রধান সমস্যা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশ জুড়ে চলছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনার বিষয়ে কিছু সমালোচনাও জানিয়েছেন। এই সমালোচনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তারা বলেছেন, কার্ড দিতে ঘুষ দিতে হবে কিনা। অর্থাৎ দেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে অতীতেও যেভাবে দুর্নীতি-অনিয়ম দেখা গেছে, সেটা যেন আর না হয়। এই সমালোচনা থেকে এই বার্তা নেওয়া যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজনকে ফ্যামিলি কার্ড করানোর জন্য যেন জনপ্রতিনিধিদের কাছে অসহায়ত্ব না দেখানো লাগে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন না পর্যবসিত হয়। বরং এটি যেন গৃহিণীদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়। পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি ধ্বংস করে দিতে পারে ফ্যমিলি কার্ডের ভবিষ্যৎ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই কার্ডের সুফল মা-বোনেদের কাছে পৌঁছাতে পারলেই হবে প্রকৃত সফলতা। এর আগে জিততে হবে নির্বাচনে।
লেখক- সাবেক শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন