রহমান মৃধা
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

দুর্নীতিবাজদের ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না

রহমান মৃধা। ছবি : সংগৃহীত
রহমান মৃধা। ছবি : সংগৃহীত

যে রাজনৈতিক শ্রেণি মুখে দুর্নীতিবিরোধী বুলি আউড়ে, তারাই বাস্তবে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে শুরু করে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত, এই নামগুলোই বারবার ঘুরে ফিরে আসে। একই মুখ, একই পরিবার, একই সিন্ডিকেট। আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রশাসন, আইন আর নীরবতা।

আজ বাংলাদেশ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে দুর্নীতি আর জালিয়াতিতে আমরা আর আঞ্চলিক খেলোয়াড় নই, আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ব্যাংক লুট, প্রকল্প লুট, নিয়োগ লুট, শিক্ষা লুট, ভোট লুট, সবকিছুই এখন একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এটাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালানো যাবে না। এটি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনতেই হবে। এতবার, এত অংকের অর্থ কে দিচ্ছে, কীভাবে দিচ্ছে, আর কার অনুমতিতে দিচ্ছে? এই টাকা কি আকাশ থেকে পড়ে, নাকি এটি রাষ্ট্রের ব্যাংক, আমানতকারীর ঘামঝরা সঞ্চয়, জনগণের করের অর্থ?

বাস্তবতা হলো, বড় বড় ঋণখেলাপিরা একা এই লুট চালায় না। তারা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতায় বসে। ঋণ পুনঃতফসিলের নামে চুক্তি স্বাক্ষর হয়, শর্ত শিথিল করা হয়, সুদ মওকুফ করা হয়। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, এই প্রক্রিয়ার কোনো কোনো ধাপে তদন্ত সংস্থা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে বলে শোনা যায়। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে যায়। এই অর্থনৈতিক দুর্নীতির সঙ্গে রাষ্ট্রের কোন কোন প্রতিষ্ঠান যুক্ত, আর বিনিময়ে তারা কী পেয়েছে?

এটা কি তাদের বাপের টাকা যে ইচ্ছামতো কাগজে কলমে মুছে ফেলবে, আবার নতুন ঋণ নেবে, আবার খেলাপি হবে? একটি সভ্য রাষ্ট্রে এমন কিছু ঘটতে পারে না। আর যদি ঘটে, তাহলে ধরে নিতে হয় সেখানে জবাবদিহিতা নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই, আইনের ভয় নেই।

এই প্রক্রিয়াই প্রমাণ করে যে দেশে দুর্নীতি আর ব্যক্তিগত অপরাধের স্তরে নেই। এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। ব্যাংক, রাজনীতি, প্রশাসন আর নীরব আইন একে অন্যকে ঢেকে রাখছে। যদি জবাবদিহিতা থাকত, তাহলে একবার খেলাপির পর দ্বিতীয়বার ঋণ পাওয়ার প্রশ্নই উঠত না। যদি রাষ্ট্র শক্ত হতো, তাহলে কোনো তদন্ত সংস্থা এই লুটের ওপর অনুমোদনের সিল মারতে পারত না।

এই জায়গাতেই রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। আর রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্যে, করের বোঝায়, কর্মসংস্থানের সংকটে, এবং ভবিষ্যৎহীনতায়।

এই বাস্তবতা সামনে না আনলে আমরা শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলব, কিন্তু ব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে দেব। আর যতদিন এই ব্যবস্থা অক্ষত থাকবে, ততদিন নতুন নতুন ঋণখেলাপি জন্ম নেবে, নতুন নতুন চুক্তি হবে, আর দেশ আরও গভীর খাদে নামবে।

নির্বাচন সামনে। ঠিক এই মুহূর্তেই জাতির সামনে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি আবারও এই ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজ, লুটেরা শ্রেণিকে বৈধতা দেব, নাকি এবার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে সরকার ও রাষ্ট্রকে বাধ্য করব।

কথা দিয়ে হবে না। কমিটি দিয়ে হবে না। তদন্তের নামে সময় নষ্ট করেও হবে না। এখন দরকার দৃশ্যমান, নির্মম, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।

প্রথমত, বড় ঋণখেলাপিদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, ছাড় নেই। দ্বিতীয়ত, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। যারা রাষ্ট্রের টাকা ফেরত দেয় না, তারা রাষ্ট্র শাসনের অধিকার পায় না। তৃতীয়ত, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

চতুর্থত, বিচার হতে হবে দ্রুত এবং প্রকাশ্যে। যেন মানুষ দেখে, বোঝে, বিশ্বাস করতে শেখে যে আইন এখনও মৃত নয়। পঞ্চমত, ঋণ পুনঃতপশিল ও চুক্তি অনুমোদনের সব পর্যায়ে তদন্ত সংস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, ঋণখেলাপি ও অনুমোদনদাতাদের একে অপরকে ঢেকে রাখার সুযোগ থাকবে না। যেখানে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেখানে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এমন লুটের সুযোগ না থাকে, তার জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

এখন সময় অপ্রিয় সত্য বলার। সময় সৎ সাহস দেখানোর। যারা এতদিন লুটের ব্যবস্থার বাইরে থেকেও মাথা নোয়ায়নি, যারা পেশাদারিত্ব, সততা আর যোগ্যতা দিয়ে দেশ গড়তে চায়, এই লেখা তাদের জন্যও একটি আহ্বান। সামনে আসুন। রাজনীতিকে দখলমুক্ত করতে হলে যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই।

এই দেশ কারও ব্যক্তিগত ব্যাংক নয়। এই রাষ্ট্র কোনো সিন্ডিকেটের সম্পত্তি নয়। এবং জনগণ আর নির্বাক দর্শক হয়ে থাকবে না।

এখন সময় এসেছে শুধু অভিযোগ নয়, প্রমাণ এবং ব্যবস্থা দেখানোর। দেশ কি আবার ঋণখেলাপি ও চাঁদাবাজদের বন্দোবস্ত করবে, নাকি এবার সৎ, যোগ্য এবং দায়িত্বশীল নাগরিকদের হাতে ক্ষমতা ফিরবে? সিদ্ধান্ত তোমার। আর যদি আমরা শোন না দিই, আর পদক্ষেপ না নিই, তাহলে ঋণখেলাপি ও চাঁদাবাজদের ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। এটা অর্থনীতির অনুমান নয়, ইতিহাসের প্রমাণ।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাটোরকে উন্নয়ন ও শান্তির শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই : দুলু

ভারতের শেয়ারবাজারে বড় ধস, ১০ লাখ কোটি হাওয়া

২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরিমার্জিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুমোদন

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাকে বহিষ্কার

ভারতের জন্য দুঃসংবাদ

১৭৬টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ

ধানের শীষে ভোট দিলে আ.লীগও সমান সুবিধা পাবে : ফখরুল

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা আমার কাজ : হামিদ

জানুয়ারিতে এলো ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স

৯ বছর প্রেমের পর বিয়ে, দুমাসেই স্বামীর করুণ পরিণতি

১০

প্রাইজবন্ডের ১২২তম ড্র অনুষ্ঠিত, লাখপতি হলেন যারা

১১

প্রতিদিনের এই ৭ অভ্যাস বারোটা বাজাচ্ছে আপনার ঘুমের, এখনই সতর্ক হোন

১২

শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে যাচ্ছে পাকিস্তান, তবে...

১৩

১১ দলীয় জোটের প্রার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৪

যে ৪ ব্যক্তি রোজা ভেঙে ফেলতে পারবেন

১৫

ছেলের দায়ের আঘাতে প্রাণ গেল মায়ের

১৬

ওসমান হাদি হত্যায় গোলাম রাব্বানীর বন্ধু রুবেলের দায় স্বীকার

১৭

তারেক রহমানের পক্ষে কোকোর স্ত্রীর উঠান বৈঠক

১৮

বিশ্বকাপে ভারত ম্যাচ বয়কট করল পাকিস্তান

১৯

কুৎসা রটিয়ে জনগণের ভোট নেওয়া যায় না : মির্জা আব্বাস

২০
X