

বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া প্রিন্সেস লাইলা পাহলভির জীবন একদিকে যেমন ছিল রঙে ভরপুর, ঠিক তেমনিভাবে তাকে পার করতে হয়েছে নির্মম জীবন। তিনি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ও সম্রাজ্ঞী ফারাহ পাহলভির কনিষ্ঠ কন্যা হলেও জীবনের বেশির ভাগ সময় তাকে মাতৃভূমি ইরান থেকে বহু দূরে নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে।
তেহরানের রাজপ্রাসাদের আড়ম্বর থেকে শুরু করে বিদেশের হোটেল কক্ষ যেন লাইলার জীবনের পথচলা শুধু একটি রাজবংশের পতনের গল্প নয়, বরং হঠাৎ বাস্তুচ্যুতি, গভীর ক্ষতি ও অপূর্ণ শোকের ব্যক্তিগত মূল্যকে তুলে ধরে। তার এই যাত্রার পুরো গল্প তুলে এনেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
লাইলা পাহলভি ১৯৭০ সালের ২৭ মার্চ তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন শাহ ও সম্রাজ্ঞী ফারাহর চতুর্থ ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শৈশবের প্রথম বছরগুলো পাহলভি দরবারের সুরক্ষিত পরিবেশে কাটান। সেখানে তিনি রাজকীয় আচার, ব্যক্তিগত শিক্ষক এবং পারস্য সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বে ঘেরা পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।
শাহর শাসনামলে ইরানের দ্রুত আধুনিকায়নের প্রভাবও তাদের পারিবারিক জীবনে ছিল। তাদের জীবনে ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্য প্রভাবের মিশ্রণের দেখা মিলত। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আড়ম্বরের মাঝেও লাইলা ছিলেন সংবেদনশীল ও অন্তর্মুখী; বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল গভীর। তবে সেই সুরক্ষিত জগত বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়। এ সময়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে ‘শাহের মৃত্যু হোক’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। এতে করে পাহলভি পরিবার ইরান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তখন লাইলার বয়স মাত্র ৯ বছর। ইরানি বিপ্লব শুধু তার বাবার শাসনের অবসানই ঘটায়নি, পরিবারটিকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও ঘরবাড়ি থেকেও বঞ্চিত করে।
এরপর শুরু হয় এক অনিশ্চিত জীবন। পরিবারটি মিসর, মরক্কো, বাহামা, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও পানামায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। রাজনৈতিক চাপ, হত্যার হুমকি এবং আশ্রয় দিতে দেশগুলোর অনীহার মধ্যে এই সময় কাটে। একই সঙ্গে শাহ জটিল লিম্ফোমা রোগে ভুগছিলেন। এর ফলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৮০ সালের ২৭ জুলাই কায়রোতে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির মৃত্যু হয়। তখন লাইলার বয়স ১০। বাবার মৃত্যু ইরানে ফেরার সব আশা নিভিয়ে দেয় এবং পরিবারের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে আরও গভীর করে। পরবর্তীতে সম্রাজ্ঞী ফারাহ পরিবারকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। লাইলা নিউইয়র্কের ইউনাইটেড নেশনস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৮৮ সালে রাই কান্ট্রি ডে স্কুল থেকে স্নাতক হন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারিসে জীবন পার করেন। এ সময়ে ফারসি, ইংরেজি ও ফরাসিসহ একাধিক ভাষায় তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে লেইলা গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম, বিষণ্নতা ও তীব্র অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এসবের চিকিৎসার জন্য তাকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে একাধিকবার চিকিৎসা নিতে হয়। এ ছাড়া তিনি ধীরে ধীরে ঘুমের ওষুধসহ বিভিন্ন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ঘনিষ্ঠজনদের মতে, এটি ছিল অনিদ্রা, উদ্বেগ ও মানসিক একাকীত্ব সামাল দেওয়ার চেষ্টা। জীবনের শেষ দিকে এসব সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, লাইলা মূলত জনজীবন এড়িয়ে চলতেন। প্যারিসে অল্প সময়ের জন্য তিনি মডেলিং করলেও এসব তার পছন্দ ছিল না। বড় ভাই রেজা পাহলভি যেখানে নির্বাসিত যুবরাজ হিসেবে রাজনৈতিক ভূমিকা নেন, সেখানে লাইলা ছিলেন নীরব ও অন্তরালে।
লন্ডনে মর্মান্তিক পরিণতি
২০০১ সালের ১০ জুন লন্ডনের লিওনার্ড হোটেলের একটি কক্ষে প্রিন্সেস লাইলা পাহলভিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন তার বয়স ছিল ৩১ বছর। তদন্তে জানা যায়, অতিরিক্ত মাত্রায় প্রেসক্রিপশন বারবিটিউরেট গ্রহণের ফলে তার মৃত্যু হয়। পরীক্ষায় তার শরীরে কোকেনের উপস্থিতিও পাওয়া যায়। এর ফলে এটিকে সম্ভাব্য আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়।
তার মৃত্যু পরিচিতজনদের জন্য ছিল গভীর ধাক্কা। তাকে প্যারিসে সমাহিত করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে পাহলভি পরিবার আরও এক শোকের মুখোমুখি হয়। ২০১১ সালে নির্বাসনে থাকা তার ভাই প্রিন্স আলি রেজারও আত্মহত্যা করেন।
মন্তব্য করুন