বিশ্ব মা দিবস আজ। সারাবিশ্বে যখন এ দিবসটি ঘটা করে পালন করা হচ্ছে ঠিক তখনই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ফিলিস্তিনি মায়েরা। সন্তান হারানোর শঙ্কা প্রতি মুহূর্তেই তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। গাজার হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ায় ভয়াবহ দুর্দশায় দিনানিপাত করছেন।
রাওয়ান্দ মুশতাহা নামের এক ফিলিস্তিনি মায়ের দুর্দশার গল্প তুলে এনেছে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি। তিনি গাজার পূর্বাঞ্চলের শহর শেজাইয়ার বাসিন্দা। তার অন্তঃসত্ত্বাকালীন গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা শুরু হয়। তখন প্রাণভয়ে তিনি দক্ষিণ গাজায় পালিয়ে যান। যখন তার প্রসব বেদনার সময় হয় তখন তিনি খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ভর্তি হন।
মুশতাহা বলেন, হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে তেমন কোনো নার্স ছিল না। চিকিৎসকও হাতেগোনা কয়েকজন ছিলেন। এছাড়া ওষুধে চলছিল চরম হাহাকার। অপারেশনের সময় সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার কথা ছিল। তবে চিকিৎসাসামগ্রী সংকটের কারণে সেটি দেওয়া যায়নি। ফলে আংশিক অ্যানেসথেশিয়া দিয়েই তার সিজার করা হয়। একে একে তিনটি সন্তান জন্ম দেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি হাসপাতালের বেডে শুয়েই শুনলাম আমার শাশুড়ি, দুই বোন এবং স্বামীর পরিবারের অন্তত ৫০ জন ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন।
আনাদোলু জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় মুশতাহার বাড়িও ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে তার আর কোনো ঠিকানা নেই। এমনকি স্বামী বেঁচে আছে কিনা তাও তখনো তার জানা নেই। চারদিকে এমন অনিশ্চতার মাঝে তার চিন্তা কেবল সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা। মৃত দাদি আর খালাদের নামে সন্তানদের নাম রাখেন তিনি।
এরপর আরও ভয়াবহ জীবন শুরু হয় মুশতাহার। কেননা ইসরায়েলি বাহিনী এবার গাজার দক্ষিণাঞ্চলেও হামলা শুরু করেছে। তিন নবজাতককে নিয়ে কোথায় যাবেন এমন স্বপ্নে যখন তিনি বিভোর তখন তার স্বামী তার খোঁজে খান ইউনিসে চলে আসেন। স্বামীকে ফিরে পেয়ে বাঁধভাঙ্গা কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কেননা ইসরায়েলি হামলায় স্বামী মারা গেছেন বলেই ভেবেছিলেন তিনি। ফলে স্বপ্নেও ভাবেননি যে তিনি স্বামীকে ফিরে পাবেন।
মুশতাহা জানান, স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে তিনি দেইর আল বালাহ শহরে পালিয়ে যান। সেখানে একটি তাঁবুতে আশ্রয় নেন তারা। কিন্তু চারদিকে খাবারের হাহাকার। নিজেরা কি খাবেন আর সন্তানদের কি খাওয়াবেন তা নিয়ে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম।
ফিলিস্তিনি মা জানান, এখানে খাবার নেই, পানিও নেই। নিজের খেতে পাই না বলে বাচ্চারাও ঠিকঠাক দুধ পায় না। বাজার থেকে দুধ কিনে খাওয়াবেন এমন অবস্থাও নেই। তাঁবুতে রাতের বেলা ভয়ানক ঠান্ডা আর দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম। এতে করে বাচ্চারা প্রতিদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান, আমি মনে হয় ওদের বাঁচাতে পারব না।
মুশতাহা এখনো জানেন না যে, আদৌ তিনি নিজের জন্মভিটায় ফিরে যেতে পারবেন কি না। তার মতো লাখ লাখ ফিলিস্তিনি মা কঠিন দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউয়ের তথ্যমতে, গাজায় অন্তত এক লাখ ৫৫ হাজার অন্তঃসত্ত্বা পানিশূন্যতায় ভুগছেন।
মন্তব্য করুন