বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানকে ভয় দেখাতেই কি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি

আলজাজিরার বিশ্লেষণ
ইরানকে ভয় দেখাতেই কি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি

ইরানের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন দেশটির ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, তাদের এ তৎপরতা সেটারই একটি বড় সংকেত হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে চান। সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনা করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

এদিকে ট্রাম্পের সর্বশেষ এ ঘোষণার বেশ আগে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ আরব সাগরে মোতায়েন করা হয়েছে। ওই এলাকায় কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের একটি এই ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। তাহলে ট্রাম্প কি ইরান সরকারকে ভয় দেখাতেই ইরান উপকূলে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছেন?

যাই হোক, গত বছরের জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের সামরিক শক্তি এ অঞ্চলে মোতায়েন করেছিল। তখন ওয়াশিংটন তাদের মিত্র ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছিল। এরপর গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগরে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছিল। এর কয়েক সপ্তাহ পরই তারা ভেনেজুয়েলার নৌযানের ওপর হামলা চালাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, সেগুলো মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবশ্য এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ তারা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। অভিযোগ ওঠেছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়েছে। ট্রাম্প এ সুযোগে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সাহায্য আসছে’। তিনি হুমকি দেন, ইরান যদি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে তিনি সামরিক ব্যবস্থা নেবেন।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প তার হুমকি কিছুটা কমিয়ে আনেন, যখন ইরান সরকার তাকে আশ্বাস দেয়, কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। গত সপ্তাহে যখন বিক্ষোভ পুরোপুরি দমে আসে, তখন ট্রাম্প দাবি করেন, তার চাপের কারণেই মৃত্যুদণ্ড বন্ধ হয়েছে। তবে ইরান তার এ দাবি অস্বীকার করেছে। এসব সত্ত্বেও ট্রাম্পের কঠোর কথাবার্তা এবং ইরানের উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এ অস্বাভাবিক অবস্থান দেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যে কোনো সময় হামলা শুরু হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, এ সামরিক সরঞ্জামগুলো ‘সতর্কতা হিসেবে’ নেওয়া হয়েছে। দরকার পড়লে ব্যবহারের জন্য সেগুলো মোতায়েন করা হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের বিশাল একটি নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে। হয়তো আমাদের এটি ব্যবহার করতে হবে না।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিলে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা চালাবে, যা গত জুনের হামলাকেও তুচ্ছ প্রমাণ করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যেসব সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: গত সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নিশ্চিত করেছে, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে পারমাণবিক শক্তিচালিত যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।

গত মঙ্গলবার মার্কিন বিমানবাহিনীও (অ্যাফসেন্ট) তাদের ঘাঁটিগুলোতে কয়েক দিনব্যাপী যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিবৃতিতে বিমানবাহিনী জানায়, এ মহড়া তাদের দ্রুত সরঞ্জাম ও কর্মী মোতায়েনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।

২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে। ২০২৫ সালের জুন নাগাদ এ অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল বলে জানা যায়। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আটটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

২০২৫ সালের ২৩ জুন ইরান কাতারের আল-উদাইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। এর আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালানোর কারণে তারা এ হামলা চালিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের ক্ষমতা কেমন: ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। এতে ছয় থেকে সাত হাজার সেনা ও নাবিক থাকেন। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ৩’-এর প্রধান জাহাজ। ৩৩৩ মিটার লম্বা এ জাহাজ বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি। এটি পারমাণবিক শক্তিতে চলে, যার ফলে এটি ডিজেল ছাড়াই দশকের পর দশক চলতে পারে।

এ জাহাজের সঙ্গে অন্তত তিনটি ছোট ও দ্রুতগতির ডেস্ট্রয়ার জাহাজ রয়েছে, যেগুলো এ বড় জাহাজকে পাহারা দেয়। এসব জাহাজ ইস্পাত দিয়ে তৈরি এবং এগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে ও শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম। এ নৌবহরে সাধারণত একটি ক্রুজার জাহাজ, একটি অ্যাটাক সাবমেরিন এবং একটি মালামাল সরবরাহকারী জাহাজও থাকে। এর সঙ্গে থাকা বিমানবাহিনীতে ৬৫টি যুদ্ধবিমান থাকে।

গত জুনের হামলায় কী ঘটেছিল: ২০২৫ সালের ২২ জুন রাতে চার হাজার মার্কিন সেনা ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ইরানের ওই কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।

পাহাড়ের অনেক গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করতে ‘বাংকার-বাস্টার’ বা বাংকারবিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল। এগুলো বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে ফেলা হয়েছিল। এটি ছিল ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি হামলা।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও হামলার জন্য প্রস্তুত: বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরানে আবারও হামলা হতে পারে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো বলবেন তিনি সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এ হামলা চালিয়েছেন। তবে এ হামলার ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরান যদি মনে করে তাদের অস্তিত্ব সংকটে, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা করতে পারে। এটি ট্রাম্পের জন্য নির্বাচনের বছরে বড় বিপদ হতে পারে।

ইরান পাল্টা আঘাত হিসেবে তেলের খনিগুলোতে হামলা করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ বন্ধ করে দিতে পারে। এ ছাড়া তারা ইসরায়েলের ওপরও হামলা চালাতে পারে।

গেরানমায়েহ আরও বলেন, গত জুনে হামলার পর ইরান বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। কিন্তু এবার তারা তেমনটা করবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ মনে করেন, এখনই হামলা না-ও হতে পারে। কারণ, এরই মধ্যে বিক্ষোভ ইরান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এ ছাড়া এ ধরনের হামলা অনেক ব্যয়বহুল। এর উদ্দেশ্যও পরিষ্কার নয়।

ভায়েজ সতর্ক করে বলেন, যে কোনো সামরিক সংঘাতের চূড়ান্ত ফল ভোগ করতে হবে ইরানের ৯ কোটি সাধারণ মানুষকে। এতে দেশটির সরকার টিকে থাকলেও তারা জনগণের ওপর আরও কঠোর হবে এবং এ অঞ্চলে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের নতুন রানি রিবাকিনা

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ও ইইউর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ইরানের

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব ড. একেএম শাহাবুদ্দিন

গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা, শিশুসহ নিহত ২৯

ধর্ম নয়, আমাদের কাছে মুখ্য দেশের মানুষ : তারেক রহমান

ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে সতর্কবার্তা ইসি সানাউল্লাহর

বিএনপির ৩০ নেতাকে বহিষ্কার

দারাজে শুরু হচ্ছে “২.২ গ্র্যান্ড রমজান বাজার”, ফ্ল্যাশ সেল ৮০% ছাড়

ছাত্রদলের ৪ নেতাকে বহিষ্কার

আল্লাহ আমাকে সহজ-সরল, নিষ্ঠাবান একটি আত্মা উপহার দিয়েছেন: শবনম ফারিয়া

১০

তারেক রহমানের সহায়তাপ্রাপ্ত অন্ধ গফুরের বাড়িতে হামলা-লুটপাট

১১

শিক্ষকদের ভাতা নিয়ে জরুরি নির্দেশ

১২

নতুন খবর দিল পাকিস্তান

১৩

সিরাজগঞ্জের জনসভার মঞ্চে তারেক রহমান

১৪

ছাত্রদলের ৪ নেতাকে বহিষ্কার

১৫

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে এআই ড্রোন ব্যবহার করুন

১৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত ইরান : আরাগচি

১৭

আইসিসিকে উগান্ডার অভিনব চিঠি

১৮

‘ইত্যাদি’ এবার ভোলায়

১৯

মজিবুর রহমান মঞ্জুর ‘নির্বাচনী ডিজিটাল ক্যারাভ্যান’ উদ্বোধন

২০
X