মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৪, ০৩:৩২ এএম
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৪, ০৮:২০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
স্বজনের কান্না

দুচোখ হারিয়ে অন্ধ স্কুলছাত্র ইমরান

সরেজমিন ঢামেক হাসপাতাল
দুচোখ হারিয়ে অন্ধ স্কুলছাত্র ইমরান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের তৃতীয় তলায় চক্ষু বিভাগের ৩০৫ নম্বর ওয়ার্ডের দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই ডান পাশের বেডে শুয়ে আছে ১৫ বছরের এক কিশোর। চোখে অস্ত্রোপচার শেষে খুলে দেওয়া হয়েছে ব্যান্ডেজ। এখন কিছুটা সুস্থ। তবে নিভে গেছে ওই কিশোরের চোখের আলো। এই কিশোরের নাম ইমরান হোসেন। পড়ে উত্তরার বেসরকারি মনোয়ারা স্কুলে নবম শ্রেণিতে।

ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দার গ্রিল ধরে বারবার চোখ মুছছেন এক নারী। মোবাইল ফোনে কথা বলছেন হয়তো কোনো এক স্বজনের সঙ্গে। নিচু স্বরে বারবার বলছেন, ‘আমার সবকিছু শেষ। আমার বাবায় আর চোখে দেখবে না। আমার বাবারে শিক্ষিত করে বড় বানামু আমি কেমনে? আমার দুঃখ-কষ্ট কী কোনোদিন শেষ হবে না? এ আমার কী হলো খোদা...’

মোবাইল ফোনে কথা শেষে তিনি ওয়ার্ডে ফিরে এলে তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তার নাম পারভীন আক্তার। অভাবের সংসার তার। ময়মনসিংহে গ্রামের বাড়ি হলেও বেড়ে উঠেছেন রাজধানীর উত্তরা এলাকায়। ছোটবেলায় বাবা-মা দুজনকে হারান। এর পর থেকে অনেকটা যাযাবরের মতো বড় হয়েছেন। অল্প বয়সে ভাইয়েরা বিয়ে দিয়েছিলেন সুখের আশায়। কিন্তু সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২২ সালে ইমরানের বাবা স্ট্রোক করে মারা যান। এরপর থেকে পারভীন অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালান। নিজে কষ্ট করলেও স্বপ্ন দেখতেন এক দিন ছেলে শিক্ষিত হয়ে বড় চাকরি করবে। সেদিন সব কষ্ট মিটে যাবে। এজন্য উত্তরায় বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করেছিলেন ছেলেকে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) পুলিশ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে সব শেষ হয়ে গেছে তার।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পারভীন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। গত বুধবার (১৭ জুলাই) ইমরানকে বলছিলাম স্কুল বন্ধ, ঘরে বসে না থেকে দেখ বাবা কোথাও কিছু করা যায় কি না। ইমরান তখন বলেছিল মা, আন্দোলন চলে। আমি বাইরে যামু না। আমি বলছিলাম কীসের আন্দোলন, দেখ বাবা কোথাও রাজমিস্ত্রির হেলপার হয়ে হলেও কাজ কর। স্কুল খুললে বাদ দিয়ে দিস। ইমরান পরেরদিন যোগাযোগ করে বেরিয়েছিল এক ভবনের রাজমিস্ত্রির হেলপার হিসেবে কাজের জন্য। বাসা থেকে বেরিয়ে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের হাউস বিল্ডিং এলাকার মূল সড়ক পেরিয়ে ইমরানের যাওয়ার কথা দিয়াবাড়ী এলাকায়। মূল সড়কে তখন আন্দোলনকারী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি ও ধাওয়া করে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইমরানও গলির মধ্যে ঢুকে যেতে দৌড় দেয়। দৌড় দেওয়ার সময় হাতে থাকা স্মার্টফোনটি পড়ে গেলে কুড়িয়ে আনতে ফের ঘুরে দাঁড়ায়। এমন সময় পুলিশের গুলির মধ্যে পড়ে যায়। ইমরানের চোখ ও শরীরে ছররা গুলি লাগে। ইমরান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পুলিশ সরে গেলে ওই এলাকার কয়েকজন ধরাধরি করে ইমরানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে।

পারভীন বলেন, আমার বাবায় যখন চোখে গুলি নিয়ে এই হাসপাতালে, তখন আমি মাইনসের বাসায় কাজ করতেছিলাম। হঠাৎ এক প্রতিবেশী ভাবি ফোন দিয়া কয় তোমার পোলার চোখে গুলি লাগছে। এই কথা শুনে আমি কি আর দুনিয়ায় আছি বলেন? দৌড়ে আসছি আন্দোলনের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেলে। অস্ত্রোপচার করে বের করা হয় ছররা গুলি। ব্যান্ডেজ খুলে দিছে। কিন্তু চোখে আর দেখবে না বলেছে ডাক্তার। পারভীন আক্ষেপ করে বলেন, গত বৃহস্পতিবার কলিজার টুকরা বাপটার যে গুলি লাগছে, এরপর থেকে আমার স্বজনরাও কেউ আর হাসপাতালে খোঁজ নিতে আসেনি।

স্বপ্ন ভেঙে বিষাদে রূপ নিলেও বিচার চান না পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, গরিব মানুষ কার বিরুদ্ধে মামলা করমু। মামলা করে ঝামেলা চাই না। আমার তো সব শেষ। ভাগ্যে যা আছে তাই হইছে। মাইনসে তো পোলা হারাইছে। ভাগ্যে ছিল পোলাডার গুলি লাগবে। এখন সুস্থ হয়ে বাড়ি যেতে পারলেই হলো। আমাদের গরিবের এত দরকার নেই।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ব্রাজিলে যোগদান কামরুলের

ঝিনাইদহে আ.লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ, আহত ২০

জেলের জালে রাজা ইলিশ, দাম ৯ হাজার

নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার

বিচার ব্যবস্থার ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই : অ্যাটর্নি জেনারেল

মাঠে ব্রাজিলের জয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় তারকাদের উল্লাস

রাবি প্রেস ক্লাবের সভাপতি ধ্রুব, সম্পাদক জিসান

৫০ বছরের ইতিহাসে এমন সুন্দর বাজেট আর হয়নি: হুইপ দুলু

বিপিও খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য

মেসির ছবি এঁকে প্রশংসায় ভাসছেন চঞ্চল চৌধুরী

১০

থাকেন ভারতে পড়েন ভারতে, কিন্তু পরীক্ষাকেন্দ্র পড়ল আমিরাতে

১১

কাতারের উপহার দেওয়া ‘উড়ন্ত হোয়াইট হাউসে’ চড়বেন ট্রাম্প

১২

নেক্সট লিডার্স ও হারামাইন গ্রুপের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব

১৩

রাত ১টার মধ্যে ১০ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির আভাস

১৪

আর কোনো বিশ্বকাপ নয়! অবসরের ইঙ্গিত দিয়ে যা বললেন মেসি

১৫

জামিনে বেরিয়ে পীর সেজে কবরস্থানে আস্তানা হত্যা মামলার আসামি

১৬

ব্রাজিলের জয়ে মাথা ন্যাড়া করলেন আর্জেন্টিনা সমর্থক

১৭

‘পাড়ায় পাড়ায় মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে’

১৮

শেষ ম্যাচে হারলে কি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবে ব্রাজিল? কী বলছে সমীকরণ

১৯

এএসআই পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ২

২০
X