বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি (ট্যারিফ) এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দরপতন বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আর্থিক খাতের সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।
অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো ছোট নয়। সম্প্রতি পিপিআরসি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা গত তিন বছরে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর প্রধান কারণ, খাদ্যের মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্য। অর্থাৎ মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। ফলে বহু মানুষ এখন দারিদ্র্যের কিনারায় অবস্থান করছে। তথ্য অনুযায়ী, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২৮ শতাংশ হলেও অল্প একটি ধাক্কা এলে আরও বড় অংশ দারিদ্র্যের নিচে চলে যাবে। আমার মতে, এটাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সবকিছুর মধ্যেও নতুন কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতির কারণে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভারতের পণ্য রপ্তানিতে খরচ বেড়েছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের ওপর ট্যারিফ কম, যা মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের মতো দেশগুলো আমাদের মতোই সুযোগ পাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করার সম্ভাবনা বেড়েছে।
আরেকটি সুযোগ এসেছে ডলারের দর কমে যাওয়ায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের দাম নির্ধারণ হয় ডলারে। ডলারের মান কমে গেলে অনেক দেশের স্থানীয় মুদ্রায় বাংলাদেশের পণ্য তুলনামূলক সস্তা হয়ে পড়ে। এতে দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের মতো বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ডলারের এই দরপতন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চাহিদা বৃদ্ধির একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
সুযোগ থাকলেই হবে না, তা কাজে লাগাতে প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি ও সুশাসন। বন্দরে জট, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে ঘুষ, এনবিআরের অদক্ষতা—এসব সমস্যা রপ্তানিকারকদের ভোগাচ্ছে। আবার শ্রমিক অসন্তোষও বড় বাধা। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের এক মাসের বেতন তিন মাস পর দেওয়া হয়। ফলে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাওয়া সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা। শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত দেওয়া, লজিস্টিক খাতের জটিলতা কমানো এবং কাস্টমস প্রক্রিয়াকে সহজ করা গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বাজারে বাড়তি চাহিদা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। তা না হলে সুযোগগুলো সম্ভাবনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ড. জাহিদ হোসেন
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ
মন্তব্য করুন