

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ শরিকদের জন্য ১৭টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তাদের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুপগৎ আন্দোলনের সাত শীর্ষ নেতা। তবে ধানের শীষ না পেয়ে এর মধ্যে পাঁচ আসনেই বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন বিএনপির নেতারা।
মিত্রদের দাবি, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকলে ধানের শীষের বিজয় বিঘ্নিত হতে পারে। তাই তারা চান, বিএনপির নেতারা কোনো ব্যানারেই যেন ভোটের মাঠে না থাকেন। এ বিষয়টি শরিকদের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বিএনপিকে জানানো হয়েছে। বিএনপিও এসব ‘অভিমানী’ প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরাতে তৎপরতা শুরু করেছে। সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা করছে দল। এজন্য মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামী ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। বিএনপির প্রত্যাশা, এই সময়ের মধ্যে বিষয়টির মীমাংসা হবে। তারপরও নির্বাচনের মাঠে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে দল।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যারা প্রার্থী হয়েছেন, সেটা দল দেখছে। আমাদের মতো এত বড় দলে যোগ্য প্রার্থী প্রচুর। সেখানে অনেকেই হয়তো মনে করেছেন, দল থেকে তাকে মনোনীত করা হলে আরও ভালো হতো। তারা সেজন্য চেষ্টা করছেন। তবে প্রত্যাহারের (মনোনয়ন) সময় এখনো শেষ হয়নি। আমরা তাদের আহ্বান জানিয়েছি, দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যেন তারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। আমরা আশা করছি, তারা সেটা করবেন। অনেকেই এরই মধ্যে প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন আমাদের। আমি মনে করি, প্রত্যাহার করার সময়ের মধ্যেই এই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়ে যাবে। নইলে দল তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।
দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন কিংবা জোটগত সমঝোতার বাইরে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দল এরই মধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি যারা ক্ষোভ বা হতাশার কারণে বিদ্রোহী অবস্থানে গেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। একটা বড় রাজনৈতিক দলে বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক প্রত্যাশা থাকে। আসন সমঝোতা, জোটগত হিসাব-নিকাশ ও বহুদলীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের বহু যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হয়েছেন। সেখান থেকেই কিছু মনঃকষ্ট তৈরি হয়েছে। তাই তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদ্রোহী বা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা (দল) কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে তাদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। আশা করছি, বিষয়গুলোর মীমাংসা হবে।
বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন ১২টি রাজনৈতিক দলের ১৭ জন শীর্ষ নেতা। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দলগুলো ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক। তাদের কেউ ধানের শীষে, আবার কেউ নিজেদের দলীয় প্রতীকে ভোট করছেন। বিজয় নিশ্চিতে কৌশলের অংশ হিসেবে কেউ কেউ নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করেছেন। আবার দলীয় কৌশলের অংশ হিসেবেও কেউ শুধু নিজে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ নিয়েছেন। মূলত সংশোধিত আরপিওর কারণে এই কৌশল অবলম্বন করে বিএনপি।
বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী ৯টি আসনে নিজ নিজ প্রতীকে ভোট করছে ৬টি দল। দলগুলো হলো—বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, জমিয়ত ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি। অন্যদিকে, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে সাতটি দলের সাতজন শীর্ষ নেতা ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট করছেন। তাদের মধ্যে অনিবন্ধিত দুটি দল নিজেকে বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করে। দল দুটি হলো বাংলাদেশ এলডিপি ও বাংলাদেশ জাতীয় দল। বাংলাদেশ এলডিপির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১ এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫ থেকে ধানের শীষে ভোট করছেন। আর নিবন্ধিত চারটি দলের (এলডিপি, গণঅধিকার পরিষদ, আমজনতার দল ও এনডিএম) চারজন শীর্ষ নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ পান। এলডিপির সাবেক মহাসচিব রেদোয়ান আহমদ কুমিল্লা-৭, গণঅধিকারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ), আমজনতার দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া হবিগঞ্জ-১ এবং এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের আহ্বায়ক ও অনিবন্ধিত এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে ১২ দলীয় জোটভুক্ত ‘অনিবন্ধিত’ জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব রশিদ বিন ওয়াক্কাস ধানের শীষ নিয়ে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসন থেকে ভোট করছেন। তবে সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ ইকবাল হোসেন নির্বাচনে রয়েছেন। তাই শরিকদের মধ্যে স্বস্তিতে রয়েছেন শুধু শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ। বাকি পাঁচটি আসনেই বিএনপির নেতারা ধানের শীষ না পেয়ে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে’ নির্বাচনের মাঠে আছেন।
এলডিপি থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে ধানের শীষে মনোনয়ন পান ড. রেদোয়ান আহমদ। অন্যদিকে, এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ থেকে ধানের শীষের মনোনয়ন পান। কিন্তু এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।
রাশেদ খান বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ হলো ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। যারা প্রকৃত বিএনপি করেন, তারা অবশ্যই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা মানবেন। ঝিনাইদহ-৪ আসনে আমাকে তারেক রহমানই পাঠিয়েছেন। এখানে যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তাদের অভিমান থাকা স্বাভাবিক। আশা করি, শেষ পর্যন্ত কেউ দলের বিদ্রোহী হবেন না।’
সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি এখানে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। এলাকার সিংহভাগ বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তার সঙ্গে আছে। একজন লোভী মানুষকে অন্য দল থেকে নিয়ে এসে বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ধানের শীষ দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্যায় প্রতিরোধে আমি ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করতে এসেছি। কালীগঞ্জের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, এলাকার সন্তানকে নির্বাচিত করবেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি।
সৈয়দ এহসানুল হুদা নিজ দল ‘বাংলাদেশ জাতীয় দল’ বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে ধানের শীষের মনোনয়ন পান। কিন্তু তার আগে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। চূড়ান্তভাবে দলের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেও তা বাতিল হয়। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেলে এই আসনেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকছে।
‘অনিবন্ধিত’ এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ আসন থেকে ধানের শীষে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু এই আসনে বিএনপি আগে মনোনয়ন দিয়েছিল নড়াইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল ইসলামকে। পরে চূড়ান্তভাবে দলের মনোনয়ন না পেলেও মনিরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন এবং তার মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে দলটির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী প্রার্থীকে বসিয়ে দেওয়া হবে। আমরা বিএনপির হাইকমান্ডের এই কথায় আস্থা রাখতে চাই।
মনিরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘আমি ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে এলাকায় ৩৯ বছর ধরে রাজনীতি করি। জেলা ও থানা ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়েছি, পৌর ও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, জেলা বিএনপির দুইবারের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম। আমি ভোটের মানুষ। এই জনপদে ভোটের লড়াইয়ে থাকতে চাই, এটা আমার প্রত্যাশা। আমি আশাবাদী, নড়াইলের সর্বস্তরের জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।’
কৌশলগত কারণে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঢাকা-১৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করছেন এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমরা দুটি কারণে জোট করি। জোটের মার্কার সহযোগিতা ও জোটের কর্মী বাহিনীর সহযোগিতা। তবে আরপিওতে পরিবর্তন আনার কারণে এই দুটি একসঙ্গে পাওয়া নিয়ে মুশকিল হয়। সেই জায়গা থেকে দলের পক্ষ থেকে একটি স্ট্র্যাটেজিক ডিসিশন নিয়ে আমরা ধানের শীষে গিয়েছি।
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ঢাকা-১৩ সংসদীয় আসনের ভোটারদের অনেক কাছে আমি পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। এ ক্ষেত্রে ‘মার্কা’ বিরাট সহায়ক হয়েছে। বিএনপির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনার যত ব্যক্তিবর্গ আছেন, রাজনৈতিক কর্মী আছেন, সবার কাছ থেকে আমি পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা পাচ্ছি। আমি আশাবাদী, এখানে ধানের শীষ বিজয়ী হবে।’
শরিকরা বলছেন, জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক শক্তি বিবেচনায় বিএনপি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। সেই দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকলে সেটা তাদের জন্য ফল বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এতে শরিক দলগুলো শুধু নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নয়, নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে বিএনপি দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে আসন সমঝোতার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। শুধু তাই নয়, শরিকদের সঙ্গে দলটির দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক আস্থার সম্পর্ক, সেটিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
নির্বাচনে সিদ্ধান্ত অমান্য করে জোট এবং ধানের শীষের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ায় এরই মধ্যে ১০ নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। জানা গেছে, মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে থাকা বিএনপির নেতারা নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধেও চূড়ান্তভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে দল। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এর আগে তাদের সঙ্গে শিগগির বসতে পারেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মন্তব্য করুন