

ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের দুদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তদন্তে নতুন অগ্রগতি হিসেবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আরও একটি ভিডিও ফুটেজ পুলিশের হাতে এসেছে, যেখানে দুই শুটারের চেহারা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈনু মারমা কালবেলাকে বলেন, নতুন পাওয়া ভিডিও ফুটেজে শুটারদের মুখমণ্ডল তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, আগের সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে নতুন ভিডিও মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার আগে ও পরে শুটারদের গতিবিধি, পালানোর রুট এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করতে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। আশপাশের সড়ক, দোকান ও ভবনের ক্যামেরা ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার কিংবা পূর্বশত্রুতার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মুসাব্বিরের পারিবারিক সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার চলাফেরা, সাম্প্রতিক হুমকি ও যোগাযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, চেহারা স্পষ্ট হলেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত করা সব সময় সহজ হয় না। তবে নতুন ফুটেজ আমাদের তদন্তে বড় সহায়ক হবে বলে আশা করছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে হত্যায় অংশগ্রহণকারীরা ভাড়াটে খুনি; কিন্তু তাদের নাম-পরিচয় এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে জোর তদন্ত চলছে।
গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগে যাদের আটক করা হয়েছিল, তাদের এলাকায় প্রভাব কমে যাওয়ার সুযোগে ওই স্থানটি মোসাব্বির নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এমন অভিযোগ উঠে আসে। বিষয়টি ঘিরে এলাকায় তখন থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
এদিকে ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ ওই গ্যারেজ দখলের ঘটনায় মুসাব্বিরের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে মোসাব্বিরের জীবননাশের হুমকি-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর সঙ্গে বাস্তব কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সে দিকটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, কারওয়ান বাজার, তেজতুরি বাজার ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষের সঙ্গে মুসাব্বিরের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। একই সঙ্গে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি পক্ষের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন ঘিরে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল। এ ছাড়া ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত একটি অংশের সঙ্গেও তার বিরোধ থাকতে পারে। সবকিছু আমলে নিয়েই তদন্ত চলছে।
দলীয় নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ: এদিকে আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন কারওয়ান বাজারের দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে কারওয়ান বাজারের বসুন্ধরা শপিংমলের পেছন থেকে মিছিল শুরু হয়ে ফার্মগেট হয়ে থানার সামনে অবস্থান করেন বিক্ষোভকারীরা। এরপর মিছিলটি আবার কারওয়ান বাজার গিয়ে শেষ হয়।
বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানান।
ওসি ক্যশৈন্যু মারমা বলেন, বিক্ষোভকারীরা মিছিল করতে করতে থানার সামনে এসে অবস্থান করেন। ২০-২৫ মিনিট থানার সামনে অবস্থান করে তারা কারওয়ান বাজারের দিকে চলে যান। তবে ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার রোডে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
গত বুধবার রাত ৮টার পরে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় স্টার কাবাবের গলিতে গুলিতে নিহত হন আজিজুর রহমান মোসাব্বির। এ সময় কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মন্তব্য করুন