রাজধানীতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে জনমনে টানটান উত্তেজনা ও শঙ্কা বিরাজ করছে। নগরবাসীর এই শঙ্কা দূর করতে ক্ষমতাসীন দল রাজধানী ঢাকাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকাল থেকেই শহরজুড়ে পাহারার চাদরে ঘিরে রাখবে। একই সঙ্গে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। এজন্য প্রতিটি এলাকায় মোড়ে মোড়ে, অলিগলিতে, প্রধান সড়কে পাহারায় থাকবেন ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এদিন রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ ফটকে মহাসমাবেশের সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হলেও সমাবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়ে চলে নাটকীয়তা। সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ
হারুন অর রশিদ অনুমতি দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও রাত পর্যন্ত ডিএমপি সিদ্ধান্তহীনতায় থাকে। চলে একের পর এক মিটিং। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনুমতি নিয়ে দোলাচলে থাকায় মঞ্চ তৈরি, মাইক স্থাপন করাসহ অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ স্থগিত থাকে। পরে রাতে সোয়া ৮টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অনুমতি দেওয়ায় মঞ্চ তৈরির কাজ ফের শুরু হয় বলে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতারা নিশ্চিত করেছেন।
এ বিষয়ে রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খ মহিদ উদ্দিন সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে জানান। তিনি জানান, বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে ২০ শর্তে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ২০ শর্তে তাদের পছন্দের জায়গায় সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে ডিএমপি। আজ আওয়ামী লীগ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকেই সমাবেশ করবে। অনুমতি পাওয়ার পরপর রাতেই মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু করে আওয়ামী লীগ।
গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে মঞ্চ তৈরির কাজ চলমান থাকলেও দুপুরের পর পুলিশ মঞ্চের কাজ স্থগিত রাখতে আওয়ামী লীগকে অনুরোধ করে। অনুমতি না পাওয়ায় মঞ্চের কাজ স্থগিত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সমাবেশস্থলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে দেখা গেছে। এদিকে সমাবেশের অনুমতির জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ কালবেলাকে বলেন, আমরা সমাবেশের অনুমতি পেয়েছি। যেভাবেই হোক রাতেই সমাবেশের প্রস্তুতির কাজ সম্পন্ন করা হবে।
তবে ঢাকা শহরের মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ইউনিট ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অলিগলিতে সন্ধ্যা থেকেই পাহারা শুরু করেছেন। সারা শহরের গলিগলিতে দ্বিতীয় দিনের মতো মিছিল অব্যাহত রেখেছে দলটি। নিউমার্কেট, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, পুরান ঢাকা, হাজারীবাগ, উত্তরা, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, বংশালসহ প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে মিছিল করে ক্ষমতাসীন দল। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কমিশনাররা শাহবাগ, ধানমন্ডিসহ নগরের প্রতিটি জায়গায় মিছিল ও অবস্থান বজায় রেখেছেন। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করে আজ (শনিবারের) মহাসমাবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান কালবেলাকে বলেন, আমাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা আছে। মহাসমাবেশ সফল করতে যা করণীয় তাই করা হবে।
এদিকে ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের উদ্যোগে শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রা করে আওয়ামী লীগের এই যুব সংগঠন। এ সময় যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, বিএনপি-জামায়াতের যে অপশক্তি, সেই অপশক্তি রুখে দেওয়ার জন্য অতীতের মতো শান্তি সমাবেশে এবং রাজপথে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিয়ে যুবলীগের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করবে। শুধু সমাবেশ নয়, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রাজপথে ও নির্বাচনী মাঠে থাকতে হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচি কেন্দ্র করে রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগে ও পরের সময়গুলোকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাঠে থাকবে ক্ষমতাসীন দলটি। নির্বাচন বানচাল করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত করতে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল কর্মসূচির নামে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। সারা দেশ থেকে সন্ত্রাসীদের জড়ো করা হচ্ছে সেই লক্ষ্যে। নগরবাসীর জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে চলবে সতর্ক পাহারা।
আমরা অশান্তি করতে চাই না, আমরা সরকারে আছি, আমরা কেন অশান্তি করব? বিএনপি অশান্তি করতে চায় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, মরতে হলেও মরব, তবুও মাঠ ছাড়ব না। এটা বাংলাদেশের আরেক মুক্তিযুদ্ধ। এটাতে জিততে পারব, যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি।
জানা গেছে, মহাসমাবেশ ঘিরে গত কয়েকদিন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও সহযোগী সংগঠনগুলো টানা বর্ধিত সভা ও মতবিনিময় সভা করে। এসব সভা থেকে মহাসমাবেশে বড় জমায়েত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিটি এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাহারার পাশাপাশি মহাসমাবেশে অংশ নিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি পাওয়া না গেলেও হেঁটে, গণপরিবহনে করে হলেও সমাবেশে উপস্থিত হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের।
একই দিন চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধনের কথা থাকায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা কেউ কেউ সেখানে থাকলেও কর্মসূচি শেষে ঢাকায় ফিরবেন বলেও জানা গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের বাইরে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের ঢাকায় থাকতে নির্দেশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
এ ছাড়া উন্নয়নের প্রচারের লক্ষ্যে মিছিলের সময় প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন বহন করার কথাও জানানো হয়েছে। লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা নিয়ে আসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন নেতারা।