দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়েছে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের ছ, জ ও ঝ বগি। বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেনটি থামার পর ১৪টি বগির মধ্যে আক্রান্ত তিন বগির একটিতে যাত্রী ওঠানামা করেছেন। তিন মিনিটের বিরতিতে ছ বগিতে বেশ কয়েকজন ওঠানামা করেন। পুলিশের সন্দেহ, যাত্রীবেশে এই বগিতে নাশকতাকারীরা উঠেছিল। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে একটি তদন্ত সংস্থা কালো জ্যাকেট পরা দুজনকে শনাক্ত করেছে, যারা বিমানবন্দর থেকে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে ওঠে। এই দুজনের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছেন এমন ৭-৮ জনের ফুটেজ পাওয়া গেছে। এর বাইরে কেউ উঠেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নাশকতাকারীরা বিমানবন্দরের আগের স্টেশনগুলোর মধ্যে কোনো একটি থেকে উঠেছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার ভোরে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে দেওয়া আগুনে নারী, শিশুসহ পুড়ে মারা গেছেন চারজন। ওইদিনই নিহত নাদিরা আক্তার পপি ও তার সন্তান মো. ইয়াছিনের পরিচয় শনাক্ত হয়। তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল বুধবার নিহত অন্য দুজনÑখোকন মিয়া ও রশীদ ঢালীর মরদেহ শনাক্তের পর ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে ঢাকা রেলওয়ে থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন রেলের পরিচালক (গার্ড) খালেদ মোশারেফ।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদ বিশ্বাস জানান, মামলায় ট্রেনে নাশকতা চালিয়ে যাত্রী হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন উইং দুর্বৃত্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে।
পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর স্টেশনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুজনের গায়েই কালো রঙের জ্যাকেট ছিল। তাদের গায়ের রং ফর্সা।
যাত্রীদের বরাত দিয়ে ওই ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, ওই দুজন ট্রেনে ওঠার পর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সিট খালি থাকলেও তারা বসেনি। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি পুড়ে যাওয়া তিনটি বগির যাত্রীদের পরিচয়ও যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রেনের আলামত পরীক্ষা করে এতে ফসফরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
জ বগির দায়িত্বে ছিলেন স্টুয়ার্ড মাঈন উদ্দিন ও ঝ বগিতে নজরুল ইসলাম। তারা জানান, বিমানবন্দরে তাদের বগিতে কোনো যাত্রী ওঠেননি। তবে ছ বগিতে থাকা স্টুয়ার্ড রিয়াদ হোসেন বলেন, তার বগিতে বেশ কিছু যাত্রী ওঠানামা করেছে।
রেল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহনগঞ্জ থেকে ট্রেনটি ছাড়ার সময় ১৪টি বগির সিরিয়াল ছিল ক, খ, গ, ঘ। ময়মনসিংহ এসে ইঞ্জিন ঘুরানোর কারণে ঢাকাগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে বগিগুলোর ছিল ঘ, গ, খ, ক সিরিয়ালে। আগুনে পুড়ে যাওয়া তিনটি বগির সিরিয়াল ছিল ঝ, জ, ছ। সামনের দিকে ঝ ও জ বগিতে প্রথমে আগুন লাগে। পরে এই আগুন ছ বগিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন দেওয়া হয় দুই বগির মাঝে: ট্রেনে প্রথম আগুন দেওয়া হয় জ ও ঝ বগির মাঝখানে। রেলের কর্মীরা যখন এই আগুন নেভাতে ব্যস্ত, তখনই বগির ভেতরে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা, যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ছ বগিতেও। মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস রাত ৪টা ৩৭ মিনিটে বিমানবন্দর স্টেশনে থামে। তিন মিনিট বিরতি দিয়ে ৪টা ৪০ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যায়। এর তিন মিনিট পর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে জ ও ঝ বগির মাঝে আগুন দেখতে পান রেলের কর্মী ও যাত্রীরা। দুটি বগি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। যাত্রীরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। আগুন নেভাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন রেলের সংশ্লিষ্টরা। পরক্ষণেই জ ও ঝ বগিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ট্রেনটি তেজগাঁও থামার পর দেখা যায়, ছ বগিতেও আগুন দেওয়া হয়েছে।
ট্রেনটির পরিচালক (গার্ড) মো. খালেদ মোশারেফ বলেন, জ বগিতে দায়িত্বে থাকা স্টুয়ার্ড মাঈন উদ্দিন মানিক আগুনের বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্টুয়ার্ড ম্যানেজার রাহাত মিয়াকে জানান। রাহাত জানান আমাকে। ট্রেনটি তেজগাঁওয়ে যখন থামে, তখন সময় ৪টা ৫৮। খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। পরে আসে আরও দুটি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে ৫টা ৫০ মিনিটে। জ বগি থেকে শিশু, নারীসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সিসিটিভিতে আগুনের অস্তিত্ব: সৈনিক ক্লাবের কাছে সিসিটিভি ফুটেজে প্রথম আগুনের দৃশ্য ধরা পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন পার হওয়ার পর ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। কয়েকশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এমনটা দাবি করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগ।
এই বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, সম্ভাব্য সব সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেনে কোনো আগুন বা ধোঁয়া দেখা যায়নি। আমাদের ধারণা, সৈনিক ক্লাবের আগে এবং ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের পরে আগুন দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি গুরুত্ব সহকারে ট্রেনে আগুনের ঘটনার তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন যুগ্ম কমিশনার (অপারেশনস) বিল্পব কুমার সরকার। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জন্য যা যা করা প্রয়োজন সবই করছে ডিএমপি। মামলাটি রেলওয়ে থানায় হয়েছে। তবে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এক সময় মামলাটি আমাদের কাছে নিয়ে আসা হবে। তদন্তে অগ্রগতির বিষয়ে আমরা এখনই কিছু বলছি না। তবে আমাদের ধারণা, অতীতে যারা অগ্নিসন্ত্রাস ঘটিয়েছে তারাই ট্রেনে আগুন দিয়েছে।