শেখ হারুন
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৪, ০১:৪৭ এএম
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৫, ০১:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকল্পে অতি আগ্রহ বাস্তবায়নে অনীহা

আইএমইডির প্রতিবেদন
প্রকল্পে অতি আগ্রহ বাস্তবায়নে অনীহা

পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালে একটি প্রকল্প নেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয় সাত বছর। কিন্তু নির্ধারিত সময় তো দূরের কথা—৯ বছর পার হলেও এ প্রকল্পের কাজই শুরু করতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে আলোর মুখ দেখার আগেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

নোয়াখালী জেলার স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্লট নির্মাণ প্রকল্পেরও একই দশা। ২০১৭ সালে শুরু হয়ে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। তবে ছয় বছরে কাজ হয়েছে যৎসামান্য। এ কারণে এটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শুধু এই দুটি প্রকল্প নয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্ধ করে দেওয়া গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে একটিরও পুরোপুরি কাজ শেষ হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের (উন্নয়ন অনুবিভাগ-১) অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মামুনুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘অনেকদিন হয়ে গেলেও কোনো কাজ না হওয়ায় পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর প্রকল্প দুটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

এ ছাড়া অন্যান্য প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

শুধু গৃহায়ন নয়, বেশিরভাগ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে এমন চিত্র দেখা যায়। নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে অতি আগ্রহ দেখা গেলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা আর থাকে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনীহা দেখান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। এরপর সময় ও ব্যয় বাড়লেও প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয় না।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতাধীন অনেক প্রকল্প আবার শতভাগ বাস্তবায়ন না করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩০ শতাংশের কম কাজ হওয়া অবস্থায়ও শেষ করা হয় অনেক প্রকল্প। এমনকি কাজ শুরুর আগেই প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার নজিরও রয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২২-২৩ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। আংশিক কাজ হওয়ার পর প্রকল্প বন্ধের এই প্রবণতাকে অর্থ ও সময়ের অপচয় উল্লেখ করে হতাশাব্যঞ্জক বলছে আইএমইডি। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৭৭টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর মধ্যে শেষ হয়েছে ২৬৪টি প্রকল্প। এ ছাড়া নির্ধারিত তালিকায় না থাকলেও ওই সময়ে আরও ১৩টি প্রকল্প বন্ধ করা হয়। সব মিলিয়ে মোট সমাপ্ত প্রকল্প সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭৭টি। এর মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে ১৬০টির। পুরো কাজ না করেই বাকি ১১৭টি প্রকল্প সমাপ্ত করা হয়েছে। কাজ শেষ না হলেও এসব প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২৪ হাজার ৮৭৫ কোটি ৯ লাখ টাকা।

এদিকে গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) এডিপিতে ১ হাজার ৬৮৬টি প্রকল্প ছিল। অর্থবছর শেষ হলেও ১৭৯টি প্রকল্পে ২৫ শতাংশ কাজও শেষ হয়নি। এর মধ্যে ১০৪টি প্রকল্পের অগ্রগতি একেবারেই শূন্য। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হলেও এসব প্রকল্পের কোনো কাজই হয়নি। যেটাকে আইএমইডি বলছে হতাশাব্যঞ্জক। এ ছাড়া ৪৩৬ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এগুলোতে কাজ শেষ হওয়ার হার ২৬ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত।

শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছর নয়, গত পাঁচ অর্থবছরে শতভাগ কাজ না করেই প্রকল্প সমাপ্ত করা হয়েছে ৬৬৩টি। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে শতভাগ কাজ শেষ না করেই সমাপ্ত করা হয়েছে ১৮৬টি প্রকল্প। শুধু তাই নয়, এগুলোর কোনোটির আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ পর্যন্ত। ওই অর্থবছরে মোট বাস্তবায়ন হয় ৩৩৬টি প্রকল্প।

২০২০-২১ অর্থবছরে কাজ বাকি রেখেই সমাপ্ত ঘোষিত প্রকল্প সংখ্যা ছিল ১২৪টি। ওই অর্থবছরে মোট বাস্তবায়ন হয় ২৬৪টি। এর মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ করেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল ১৪০টি প্রকল্প। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে শতভাগ কাজ শেষ না করেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় ৯২টি প্রকল্প। সে সময় মোট বাস্তবায়ন হয়েছিল ১৮২টি। এর মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়া প্রকল্প ছিল ৯০টি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কাজ অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করা হয় ১৫৭টি প্রকল্প। ওই অর্থবছরে মোট বাস্তবায়ন করা হয় ৩১২টি প্রকল্প। এর মধ্যে শতভাগ করা হয়েছিল ১৫৫টির।

একই অবস্থা আর্থিক অগ্রগতির চিত্রে। অর্থবছর শেষে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ২৫ শতাংশেরও কম আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৭৮টি প্রকল্পের। এর মধ্যে ১১০টি প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি হয়নি। অর্থাৎ অর্থবছর শেষে এসব প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি শূন্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। আইএমইডির ভাষায় এটাও হতাশাব্যঞ্জক। এ ছাড়া আর্থিক অগ্রগতিতে হতাশাজনক অবস্থায় রয়েছে ৩৬১ প্রকল্প।

আইএমইডির প্রতিবেদনে ২৫ শতাংশের নিচে বাস্তবায়ন অগ্রগতিকে হতাশাব্যঞ্জক, ২৬-৭৫ শতাংশকে সন্তোষজনক নয়, ৭৬-৮৯ শতাংশকে মোটামুটি সন্তোষজনক, ৯০-৯৯ শতাংশকে সন্তোষজনক এবং শতভাগ অগ্রগতিতে প্রশংসনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে আইএমইডির প্রতিবেদনে জমি অধিগ্রহণের সমস্যা, দরপত্রে বিলম্ব, সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিকল্পনার অভাব এবং বিদেশি অর্থায়নের কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণকে দায়ী করা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন চিত্রে হতাশা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত চাহিদা এবং সম্ভাব্যতা যাচাই না করে প্রকল্প গ্রহণ করার ফলে বাস্তবায়নের এমন দৈন্যদশা দেখা দেয়। যার ফলে সরকারি অর্থের পাশাপাশি অপচয় হয় সময়। পূরণ হয় না প্রকল্পের উদ্দেশ্য। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন এমন ঘটনা ঘটছে, তা খুঁজে বের করার তাগিদ তাদের।

বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও আইএনএফের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী কালবেলাকে বলেন, ‘পুরো কাজ শেষ না করেই বন্ধ করে দেওয়ার মানে হলো, প্রকল্প গ্রহণ, প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন—সবক্ষেত্রেই দুর্বলতা ছিল। যা কোনো স্তরেই ধরা পড়েনি অথবা ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদন গোটা জিনিসটার মধ্যে এখনো শৃঙ্খলা আসেনি। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সময় এবং জনবলের অপচয় হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এডিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন এমন হচ্ছে, তার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করা দরকার। এর জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির দুর্বলতা থেকে বের হওয়া যাবে না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বড় পর্দায় আসছেন প্রভা

‘শক্তি থাকলে আসুক, হাত-পা ভেঙে দেব’, হুঁশিয়ারি জাপা নেতার

বাংলাদেশিরা ৫ কর্মদিবসেই পাবেন যুক্তরাজ্যের ভিসা, তবে...

নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবি পার্টির বিক্ষোভ

যে কারণে আগামী মৌসুমে রিয়ালকে আতিথেয়তা দিতে পারবে না লিভারপুল

দত্তক নিয়ে ৩ সন্তানের মা সানি কেন নিজে গর্ভধারণ করেননি

১৭তম সন্তানের জন্ম দিলেন ৫৫ বছরের নারী!

দেশের দুঃসময়ে জিয়া পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য : আমান

চীনে মোদিকে লাল গালিচা সংবর্ধনা, কী ইঙ্গিত করছে?

গণনা শেষ, পাগলা মসজিদের সিন্দুকে মিলল রেকর্ড টাকা

১০

সাপের মতো সুযোগ সন্ধানী শেখ হাসিনা ও তার দলবল : অধ্যাপক নার্গিস

১১

‘বাচ্চা না হলে সংসার ছেড়ে চলে যেতে হবে’

১২

তিন চমক নিয়ে ইতালির বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দল ঘোষণা

১৩

২৬ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের আমরণ অনশনের আলটিমেটাম

১৪

চার সিদ্ধান্ত জানাল ডাকসুর নির্বাচন কমিশন

১৫

নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

১৬

আফ্রিদির পছন্দের কেএফসির চিকেন আনল পরিবার, মেলেনি অনুমতি

১৭

মেয়োনিজ না পাওয়ায় ক্যাফেতে আগুন ধরিয়ে দিলেন বৃদ্ধ!

১৮

এবার ইসরায়েলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়াল রাশিয়া

১৯

তাসকিনের চার উইকেট, নেদারল্যান্ডসের সংগ্রহ ১৩৬

২০
X