ফিনল্যান্ডের জাতীয় কবি ইনো লিনো। বিশ্বজুড়ে তার পরিচিতি সুখের কবি হিসেবে। বছর বছর পৃথিবীর মধ্যে ফিনল্যান্ড যে সবচেয়ে সুখী দেশের তকমা পায়, এর নেপথ্যে ভূমিকা রাখে কবি ইনো লিনোর দর্শন। দেশটির মানুষের জীবনাচারে তার চিন্তাধারার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
সুখ নিয়ে ইনো লিনোর বিখ্যাত কবিতা ‘নকটার্ন’। বাংলায় অনুবাদ করলে যার নাম দাঁড়ায় ‘স্বপ্নমদির সুরলহরী’। এ কবিতায় ইনো লিনো সুখের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—
‘অরণ্যের নিস্তব্ধতাকে আমি স্বাগত জানাই
গোলাপি মেঘ যার মধ্য দিয়ে দিন ডুবে যায়।
নীল ধূসর পাহাড় থেকে ঘুমন্ত বাতাস
জলের ওপর ছায়া, তৃণভূমির ফুল।
এর মধ্য থেকে তৈরি করি
আমি আমার হৃদয়ের গান।
সুখ এখানে আমার নিজের রাখা।’
কবি ইনো লিনোর মতোই প্রাচীন রোমে একটা প্রবাদ রয়েছে—‘সুখ নিজের মধ্যে, সুখ কেউ রুপার থালায় সাজিয়ে আপনার সামনে হাজির করবে না।’
মানব জাতির সূচনা থেকেই তার কাছে সবচেয়ে আরাধ্য বিষয় সুখ। খ্যাতনামা দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন মানুষের সুখ আসলে কোথায়! বর্তমানে সুখের যে সূচক রয়েছে, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো পিছিয়ে থাকে অনেকটাই। তবে চলতি বছর সুখী রাষ্ট্রের যে তালিকা প্রকাশ হয়েছে, তাতে পিছিয়েছে অনেক উন্নত রাষ্ট্রও। সেখানে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়েছে বাংলাদেশও।
আন্তর্জাতিক সুখ দিবস (২০ মার্চ) উপলক্ষে জাতিসংঘের হয়ে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রকাশ করে মূলত ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ। এ সংগঠন প্রতি বছর ‘সুখী’ দেশের এ তালিকা প্রকাশ করে।
২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ রয়েছে ১২৯তম অবস্থানে। গত বছর এ অবস্থান ছিল ১১৮তম। সে হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের অবস্থান ১১ ধাপ পিছিয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ছিল তালিকার ৯৪ নম্বরে। একই সঙ্গে এবারই প্রথম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি প্রথম ২০টি সুখী দেশের তালিকায় স্থান পায়নি। দেশ দুটির অবস্থান যথাক্রমে ২৩তম ও ২৪তম। তালিকায় যথারীতি ওপরের দিকে রয়েছে নরডিক অঞ্চলের দেশগুলো। প্রথম পাঁচটি সুখী দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ড ছাড়াও রয়েছে ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও সুইডেন।
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস প্রতিবেদনে সবচেয়ে সুখী দেশ নির্ধারণের জন্য ৬টি সূচক যাচাই করা হয়। এই সূচকগুলো হলো মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সামাজিক সহায়তা, সুস্থ জীবন-যাপনের প্রত্যাশা, জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, বদান্যতা, দুর্নীতি নিয়ে মনোভাব ও ডিসটোপিয়া।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের মানুষের মধ্যে দিন দিন অস্থিরতা বাড়ছে। বেশিরভাগ মানুষ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেও সন্তুষ্ট নয় কেউ। উল্টোদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দিন আনা দিন খাওয়া জীবন-যাপন করছেন। তারা চাইছেন যে কোনোভাবে সমাজ-সংসারে টিকে থাকতে।
সুখী দেশ নির্ধারণে যেসব সূচক ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে বাংলাদেশ তেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ তালিকায় শীর্ষ পর্যায়ে থাকা বেশিরভাগ দেশেই ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের। সেসব দেশের জিডিপির আকার অনেক বড়। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে রাষ্ট্র সবল ভূমিকা পালন করে। সুস্থ জীবন-যাপনে যেসব অনুষঙ্গ রয়েছে তার প্রায় সবই নিশ্চিত করে রাষ্ট্র। এ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেবব দেশে চিরন্তন বলা যায়। ব্যক্তির মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় তেমন হস্তক্ষেপ করা হয় না।
সুখ খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে দীর্ঘ বছর ধরে গবেষণা করছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। সম্প্রতি তারা তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। এতে দাবি করা হয়, মানুষ চাইলেই সুখ খুঁজে পেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার, সফলতা বা অর্থ-সম্পদের মধ্যে খুঁজলে হবে না। সুখে থাকার জন্য দরকার মানুষ। দরকার পরিবার আর বন্ধু মিলিয়ে চারপাশে সুন্দর একটা সামাজিক সুস্থতা তৈরি করা। পৃথিবীব্যাপী ৮৫ বছর ধরে চলা এই গবেষণার ফলাফল হলো, মূলত পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো একটা সম্পর্কই পারে মানুষকে সুখী করে তুলতে। এমনকি খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়ামের চেয়ে পরিবার আর বন্ধু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শতাব্দীর পর শতাব্দী এই বাংলায় নানা ধরনের শাসক দ্বারা শাসিত হয়েছে। জলদস্যুদের প্রভাব, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ নানা সমস্যা লেগেই ছিল। তবে এর পরও সাধারণ বিচারে বাংলাদেশের মানুষ ছিল সুখী। গোয়াল ভরা গরু এবং গোলা ভরা ধান ছিল সুখের অনুষঙ্গ। পরিবারসমেত সুখে-দুখে মিলেমিশে বেশ কেটে যেত তাদের। অবসরে জমত প্রাণবন্ত আড্ডা। তবে সময়ের আবর্তে বদলেছে সব। সেই যৌথ পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবারে ঝুঁকছে সবাই। কর্মের প্রয়োজনে ছুটছে দেশ থেকে দেশান্তরে। ফলে কমছে প্রিয়জন, ভাঙছে সামাজিক বন্ধন। আর এসব প্রভাব ফেলছে মানুষের সামগ্রিক জীবনে।
সোসাইটি অব অ্যানথ্রোপলজিক্যাল রিসার্চ ইন বাংলাদেশের (সার্ব) নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবীব কালবেলাকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সুখের সূচক মেলানো যাবে না। যুগ যুগ ধরে আমাদের মানুষের সুখের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল পারিবারিক এবং সামাজিক মেলবন্ধন। কিন্তু আমরা তথাকথিত উন্নত জীবনের আশায় সেই বন্ধনকে অনেকটা আলগা করে দিয়েছি। ফলে ক্যারিয়ারমুখী হয়ে আর্থিক সফলতা মেললেও মানসিক স্থিতি আসেনি। এর বাইরে মানুষের মধ্যে অল্পতেই তুষ্ট না থাকা এবং ঈর্ষা প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকাসহ নানা কারণেই মানুষের মধ্যে সুখের ইতিবাচক দিক কমেছে।’
তিনি বলেন, ‘শহরগুলোতে মানুষ দিন দিন একাকী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে উঠছে ইট-পাথরের দালান। মাঠ নেই, সবুজ নেই। চারদিকে কেবল গিজগিজ করছে ব্যস্ত মানুষ। শহরে কোনো সামাজিক বন্ধন গড়ে ওঠেনি। একক পরিবারভিত্তিক জীবন-যাপন। এসব অনুষঙ্গ নিয়ে সুখী জীবন-যাপনের সূচকে ওঠা যাবে না।’
গবেষকরা বলছেন, প্রযুক্তির এমন উৎকর্ষের যুগে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কমছে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে অনেকেই ঈর্ষান্বিত হন।
তারা বলছেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দ্রুত বাড়ছে নগরায়ণ। কিন্তু সে অনুপাতে সুযোগসুবিধা বাড়ছে না। ঘিঞ্জি কর্মপরিবেশ, উন্মুক্ত জায়গার অভাব, পরিবার থেকে বিচ্ছেদসহ নানা কারণেই মানুষের মধ্যে গ্রাস করছে অসহায়ত্ব। অনেকেই আবার কারও সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হন। কিন্তু নিজের চেষ্টার ওপর বিশ্বাসের অভাব। ফলে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমন্বিত রূপ সমাজজীবনের ওপর খুব কমই প্রভাব রাখছে। বরং জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ক্রমান্বয়ে আর্থিক ক্ষমতা, মর্যাদা, ভোগবাদসহ পুঁজিবাদের অনুকূল বৈশিষ্ট্যদ্বারা প্রভাবিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত । অন্যদিকে, একটি বড় অংশ মৌলিক অধিকার ও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকার ভোগের সমান ক্ষেত্র অনুশীলন এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জনগণ সুখের ঠিকানা খুঁজে পায়। বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতিতে সুখ সবার জন্য নয়। যাদের অর্থ, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, সমাজে প্রভাব বিস্তার করার মতো সক্ষমতা রয়েছে সমাজ তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উন্নয়ন ও অগ্রগতির যাত্রায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং অবস্থার পরিবর্তনে রাষ্ট্রের সমদৃষ্টি ও পদক্ষেপ ব্যতীত জনগণের মধ্যে সুখের অনুভূতি জাগ্রত করা সম্ভব নয়।’
ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ খুব অস্বস্তিতে আছে। মানুষের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। দ্বিতীয়ত, দেশের উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু বেকারত্ব কমেনি। তৃতীয়ত, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রারির ঘটনা ঘটছে। শিক্ষকরাই সেখানে জড়িত। এ ধরনের ঘটনা আমরা কখনো দেখিনি। আবার বর্তমানে কিশোর গ্যাং কালচার বেড়েছে। এগুলো আমরা কখনো দেখিনি। আজকে শিশুদের খেলার মাঠ নেই, কিশোররা সুস্থ বিনোদন পাচ্ছে না। তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, অপহরণ করে, এমনকি তারা খুনাখুনি করে। এগুলো দৃশ্যমান। এগুলো যদি সূচকে প্রতিফলিত হয়ে থাকে, তাহলে তাতে তো বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই।’
অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া, বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ইএনটি সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু কালবেলাকে বলেন, ‘সুখের অপর নাম ঘুম। যাদের ঘুম ভালো হয় তারা সুখীও বটে। অনিদ্রা মানুষকে মানসিক অশান্তি, স্থূলতা ও অন্যান্য জটিল রোগের দিকে ঠেলে দেয়। এসব প্রতিরোধ করতে পারলেই সুস্থ, সবল ও সুখী জাতি গঠন সম্ভব। আর সেই ঘুমের জন্য তৈরি করতে হয় নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু আমাদের শহুরে জীবন ব্যবস্থায় বেশিরভাগ মানুষ সেটাও তৈরি করতে পারে না। ঘিঞ্জি পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস, প্রাণবন্ত আড্ডার জায়গার অভাব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, ‘অনেক দেশে বয়স্কদের ভলান্টিয়ারের কাজ করানো হয়। তাদের জন্য পেনশন স্কিম থাকে। আমাদের দেশে বয়স্কদের জন্য তেমন সুযোগ রাখা হয়নি। দেশে বয়স্ক মানুষ মানেই বোঝা। বয়স্ক মানেই বিভিন্ন কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। পারিবারিকভাবে তাদের কিছু অবস্থান থাকলেও সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান ভালো নয়। জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটিতে তরুণদের সঙ্গে বয়স্কদের সম্পৃক্ত করা হয়। তাদের খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন সুযোগ রাখা হয়েছে। বয়স্কদের জন্য অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। আমাদের সেটি নেই। এ কারণেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এদিকে নজর দেওয়া উচিত।’
অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া, বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এস এম খোরশেদ মজুমদার কালবেলাকে বলেন, ‘সুখের সঙ্গে ঘুমের বড় সম্পর্ক রয়েছে। সুখ কম মানে তার ঘুম কম হবে। মানুষের উচ্চাভিলাষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা কারণে সুখের সূচকে পিছিয়ে যাচ্ছি।