ফোকাস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না ‘ইরান জয়’

আলজাজিরার বিশ্লেষণ
ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না ‘ইরান জয়’

তেহরানে বিক্ষোভ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে তার লক্ষ্য জয় পাওয়া। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, টিকে থাকার জন্য লড়াইরত আদর্শিক ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের জয়ের কোনো সহজ পথ নেই।

ইরানের সাম্প্রতিক উত্তাল পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই ভাবছেন, দেশটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভের মুখে মার্কিন বিমান শক্তি হয়তো চূড়ান্ত ধাক্কা দিতে পারে। তবে সামরিক বিশ্লেষক ও কৌশলবিদদের মতে, ইরানের ওপর ‘দ্রুত’ কোনো মার্কিন আক্রমণ যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা ততটাই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

ইরানের শাসনব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল পিরামিড নয়। এটি একটি নেটওয়ার্কযুক্ত রাষ্ট্র, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা একে অপরের আন্তঃসম্পূর্ণযুক্ত। এ ব্যবস্থায় শীর্ষস্থানীয় কাউকে সরিয়ে দিলেও পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে না; বরং এদের বিকল্প কমান্ড সিস্টেম যে কোনো বড় ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে বহুমুখী চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে কট্টরপন্থিরা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শাসন পরিবর্তন চায়, অন্যদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকরা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী কোনো যুদ্ধের ঘোর বিরোধী। ফলে ট্রাম্পের পক্ষে বড় কোনো সামরিক অভিযান শুরু করা কৌশলগতভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েল তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চাইলেও উপসাগরীয় দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান উত্তেজনা হ্রাস এবং কূটনীতির পক্ষে। আঞ্চলিক এ দেশগুলোর সমর্থন ও ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দূর থেকে টেকসই বিমান অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব।

নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে করা ‘শিরশ্ছেদ’ হামলা অনেক ক্ষেত্রে সিনেমার মতো মনে হলেও এটি ইরানের মতো নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের জন্য অকার্যকর। সামরিক শক্তি দিয়ে হয়তো কিছু স্থাপনা ধ্বংস করা যায়, কিন্তু এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তন বা উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। বরং এ ধরনের হামলা ইরানি কট্টরপন্থিদের আরও একতাবদ্ধ করতে পারে।

স্টিমসন সেন্টার থিংক ট্যাংকের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘সব বিকল্পই বেশ ভয়ংকর।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক’ বা ‘খ’ করলে কী হবে তা জানা খুবই কঠিন বা এর পরিণতি কী হবে? এবং বিশেষ করে যদি ইরানের শাসকগোষ্ঠী মনে করে যে, তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাহলে তারা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বিরুদ্ধে সত্যিই ভয়াবহভাবে আক্রমণ করতে পারে।

২০১১ সালের লিবিয়া অভিযান একটি সতর্কতামূলক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে। বিমান শক্তি বিক্ষোভকারীদের আকাশ থেকে রক্ষা করতে পারে না, বা একটি টেকসই নিরাপত্তা ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে না। সামরিক শক্তি বড়জোর ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে বাধ্য করার একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টা হতে পারে, যা অনেক সময় হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কূটনীতির ওপর মনোনিবেশ করা একটি থিংক ট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির মতে, বিক্ষোভের ওপর ইরান সরকারের নৃশংস দমন-পীড়নের কারণে, ট্রাম্প হয়তো ‘নিজেকে একজন মানবিক হস্তক্ষেপকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন’।

এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরানের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল। ইরানি বাহিনী কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যদিও এ হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু পারসি বলেন, এবারের বিষয়টি আলাদা হতে পারে। ইরানি কর্তৃপক্ষ হয়তো এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে তারা আর আক্রমণ সহ্য করবে না। যদিও তারা জানে এর পরিণতি খারাপ হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থিঙ্ক ট্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক নায়সান রাফাতি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, উভয়ই সহ্য করেছিলেন কারণ হামলার প্রকৃতি সীমিত ছিল।

কিন্তু শাসকগোষ্ঠী বর্তমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে, এমনকি সীমিত আকারে মার্কিন হামলাও তেহরানের কাছ থেকে আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিক ধাক্কা খুব কমই ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করে। রূপান্তরের একমাত্র টেকসই পথ হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিভাজন বা উচ্চবিত্তদের স্বার্থের সংঘাত। জবরদস্তিমূলক মূলকে শক্ত করার পরিবর্তে ওয়াশিংটনের উচিত অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং এই অঞ্চলের মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়তো এই দফার বিক্ষোভ দমন করতে সক্ষম হবে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনীতির রূপান্তর ছাড়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য শাসকগোষ্ঠীকে গোঁড়ামি ছেড়ে একটি বাস্তববাদী শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসতে হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকারি কর্মচারীদের ভবিষ্য তহবিলের মুনাফার হার নির্ধারণ

খামেনিকে বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকার করলেন ইরানের নির্বাসিত নেতা

এবার ম্যাচ বয়কটের হুমকি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখলেন প্রধান উপদেষ্টা

জামায়াত-এনসিপিসহ ৪ দলকে সতর্ক করল ইসি

অর্ধশতাধিক আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, কারণ জানাল খেলাফত মজলিস 

মোটরসাইকেলে ভারতীয় সেনাদের ব্যতিক্রমী কসরত

আগামী দিনে জাতির নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান : মান্নান

এবার ভারত মহাসাগরে বিতর্কিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জে নজর ট্রাম্পের

চেতনানাশক মিশ্রিত জুস খাইয়ে লুট, গ্রেপ্তার ৫

১০

এভাবেই তো নায়ক হতে হয়!

১১

জঙ্গল সলিমপুরে শিগগিরই অভিযান : র‍্যাব ডিজি

১২

সমর্থকরা আটকে রাখলেন প্রার্থীকে, ভিডিও কলে প্রার্থিতা প্রত্যাহার

১৩

জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন : উপদেষ্টা রিজওয়ানা

১৪

ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে জমিয়তের বৈঠক

১৫

আইসিসি থেকে মিলল সুখবর

১৬

যে নিয়মে বাড়িভাড়া বাড়াতে হবে মালিককে

১৭

কড়াইল বস্তিবাসীর জন্য ফ্ল্যাট ও ক্লিনিক স্থাপনের আশ্বাস তারেক রহমানের

১৮

আমরা বুড়ো হয়ে গেছি—চঞ্চলকে বললেন পরী

১৯

রূপায়ণ সিটির বার্ষিক বিক্রয় সম্মেলন ২০২৫ অনুষ্ঠিত

২০
X