সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি ১৪ অক্টোবর ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে। অর্থনীতিতে এবারের পুরস্কার উঠেছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতির অধ্যাপক ড্যারন অ্যাসেমোগলু, সাইমন জনসন এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস রবিনসনের হাতে। তারা দেখিয়েছেন যে, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইনস্টিটিউশনের (যার ভাবার্থ হলো একটি দেশের বিদ্যমান আইনকানুন বা রীতিনীতি) ভূমিকা প্রভূত। নোবেল কমিটি তাদের বক্তব্যে বলেছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে এ বছরের নোবেল বিজয়ীরা উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রয়োগ করে নতুন যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের দ্বারা প্রবর্তিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করে এ তিন অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছেন, একটি দেশের বিদ্যমান ইনস্টিটিউশন (আইনকানুন) সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান মাপকাঠি।
এর আগে, ১৯৯৩ সালে ‘ইনস্টিটিউশন তত্ত্বে’র আলোকে অর্থনীতির সমস্যাকে বিশ্লেষণ করার জন্য অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ডগলাস নর্থ ইনস্টিটিউশনকে তুলনা করেছেন খেলার রীতিনীতি বা ‘রুল অব দ্য গেমে’র সঙ্গে। অর্থাৎ সমাজে কে কেমন আচরণ করবে এটা নির্ভর করবে সমাজে কী ধরনের আইনকানুন চালু রয়েছে তার ওপর। দেশের আইন যদি অপরাধীকে শাস্তি দিতে অপারগ হয়, দেশে অপরাধ বাড়বে। কেউ কষ্ট করে কিছু অর্জন করার পর যদি সেটা ভোগ করতে না পারে, কষ্ট করে অর্জন করতে সে নিরুৎসাহিত হবে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে কেউ যদি সহজেই পার পেয়ে যায়, স্বেচ্ছায় ঋণখেলাপি বাড়বে। নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করতে যদি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়, দেশে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটবে না। তবে ডগলাস নর্থের কাজের দৃষ্টি ছিল মন্দ ইনস্টিটিউশন কীভাবে লেনদেনের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে শ্লথ করে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে তার ওপর।
ইনস্টিটিউশন বলতে একটি দেশের সংবিধান থেকে শুরু করে বিদ্যমান সব আইনকানুন, যা সমাজকে পরিচালিত করে যেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন, ব্যক্তি স্বাধীনতা, কোম্পানি আইন, দেওলিয়া আইন, চুক্তির যথাযথ প্রয়োগ, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের ঝুঁকি ইত্যাদি বোঝায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউশন হলো প্রপার্টি রাইটস বা সম্পত্তির অধিকার। সম্পত্তির অধিকার বলতে এখানে শুধু দৃশ্যমান সম্পদকে বোঝায় না, অদৃশ্য সম্পদ যেমন কপিরাইট বা মেধাসত্ত্বকেও বোঝায়। যেমন, রেডিও বা টেলিভিশনের লাইসেন্স থেকে শুরু করে ফ্রিকোয়েন্সি প্রদান ইত্যাদি সম্পত্তির অধিকার বণ্টনের আওতায় পড়ে। তবে ফরমাল ইনস্টিটিউশনের পাশাপাশি ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিক ইনস্টিটিউশন যেমন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য সামাজিক অনুশীলনও ইনস্টিটিউশনের অন্তর্ভুক্ত। এবারের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন, একটি দেশের ইনস্টিটিউশন যত ভালো হবে, সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তত বেশি হবে।
তবে ইনস্টিটিউশন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে একটা ধনাত্মক সম্পর্ক স্থাপন করলেই বলা যায় না যে, একটি দেশের ভালো ইনস্টিটিউশন (আইনকানুন) সেই দেশের অর্থনীতির গতিকে ত্বরান্বিত করে। যেমন এ কথা অনায়াসে বলা যায় যে, যেই দেশ যত বেশি উন্নত সেই দেশের আইনকানুন, রাজনীতির মুক্তচর্চা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার তত ভালো। গবেষণার পদ্ধতিগত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু উদ্ভাবনী পদ্ধতির আবিষ্কার করেছেন নোবেল বিজয়ী এ অর্থনীতিবিদরা।
প্রথমত, তারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, ইউরোপের উপনিবেশকারী সেই সব দেশে তাদের বসতি স্থাপন করেছেন যেখানে স্থানীয় জনগণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল সেসব দেশ উপনিবেশ করা সহজ ছিল কারণ স্থানীয় জনগণের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তেমন ছিল না। উপনিবেশকারীরা তাদের বসতি স্থাপন করে নজর দিয়েছেন দেশ এবং জনগণের উন্নয়ন হয় এমনসব আইনকানুন প্রণয়নে। আবার জনগণ কম থাকায় শ্রমের আধিক্যতায় শ্রম শোষণের সম্ভাবনা কম থাকবে। তাই উপনিবেশকারীরা সেই দেশে বসতি স্থাপন করেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের এবং অন্য সবার কল্যাণ হয় এমন আইনকানুন প্রণয়ন নিশ্চিত করেছেন। উপনিবেশ সময়ে এসব দেশ কিছু পশ্চাৎপদ থাকলেও উপযুক্ত আইনের শাসনের কারণে এসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে এখন অনেক এগিয়েছে।
অন্যদিকে, যেসব ইউরোপিয়ান উপনিবেশে তুলনামূলকভাবে স্থানীয় জনগণ বেশি ছিল, সেখানে উপনিবেশ গোষ্ঠী প্রথমেই প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছে। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও ইউরোপিয়ানরা সেখানে খুব একটা বসতি স্থাপন করেনি। জনসংখ্যার আধিক্য শ্রমের সরবরাহকে সহজলভ্য করেছে যার ফলে শ্রমের শোষণের একটা সম্ভাবনা ছিল। এসব দেশে উপনিবেশকারীরা শোষণ এবং নিপীড়নমূলক ইনস্টিটিউশন বা আইনকানুন প্রতিষ্ঠা করেছেন। বৈষম্যমূলক আইনকানুনের মাধ্যমে স্থানীয় একটা ছোট্ট গোষ্ঠীকে লাভবান করেছে দেশের আপামর জনগণকে শোষণ করে। তাই এসব দেশে ভালো আইনকানুন যেমন গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বাকস্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার, চুক্তির যথাযথ প্রয়োগ ইত্যাদি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উপনিবেশ আমলে এসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা অগ্রসরমাণ থাকলেও উন্নয়ন সহায়ক আইনের শাসনের অভাবে এসব দেশ ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিবিদরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যেসব দেশে রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বেশি ছিল, ইউরোপিয়ান উপনিবেশ সেসব দেশে বসতি স্থাপন করেনি। বিশেষ করে সেই সময়ে বিভিন্ন দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ছিল অনেক বেশি। তাই যেখানে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে বেশি, সেখানে ইউরোপিয়ানরা বসতি স্থাপন করেনি। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় জীবননাশী ম্যালেরিয়ার রোগের প্রকোপের ব্যাপক তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। একইভাবে আফ্রিকার উত্তর দিকে বিষুব রেখার কাছাকাছি এবং দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যেও ম্যালেরিয়ার রোগের প্রকোপের ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। তদ্রূপভাবে, ভারতীয় উপমহাদেশে জীবনবিনাশী রোগের প্রকোপ নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তাই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে মহাজনী সিস্টেম চালু করে জনগণের একটা বড় অংশকে শোষণ করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করেছে। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা বসতি স্থাপন করে জনকল্যাণমুখী আইনকানুনের প্রবর্তন করেন। ঔপনিবেশিক আমলে মৃত্যুর এই ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সেসব দেশের মৃত্যুহারের সম্পর্ক ঋণাত্মক। অর্থাৎ যেসব উপনিবেশে মৃত্যুর হার কম ছিল ঔপনিবেশিকরা যেসব দেশে বসতি স্থাপন করে উৎপাদনমুখী আইনকানুনের প্রবর্তন করেছেন। আর যেসব উপনিবেশে মৃত্যুর হার বেশি ছিল সেখানে ঔপনিবেশিকরা বসতি স্থাপন করেনি এবং আইনকানুন ছিল শোষণমূলক।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা প্রাকৃতিক কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করে তাদের এই তত্ত্বের (ইনস্টিটিউশন) কার্যকারিতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তারা নোগালেস (Nogales) অঞ্চলের উল্লেখ করেছেন। নোগালেসকে একটি দেয়াল টেনে দুই ভাগ করা হয়েছে। দেয়ালের উত্তর পাশে হলো নোগালেস অ্যারিজোনা, যা যুক্তরাষ্ট্রের একটা অঙ্গরাজ্য। রাজ্যটির বাসিন্দারা গড় আয়ু তুলনামূলকভাবে বেশি, বেশিরভাগ শিশুই স্কুলে যায় এবং পড়াশোনা শেষ করে, সম্পত্তির অধিকার অধিকতর সুরক্ষিত এবং লোকেরা জানে যে তারা তাদের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুবিধা (সম্পত্তির অধিকার) উপভোগ করতে পারবে। রাজনীতিবিদরা যদি জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজ করে, তবে অসাধু রাজনীতিবিদদের ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ রয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে।
অন্যদিকে, দেয়ালের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত নোগালেস সোনোরা, যা মেক্সিকোর একটি অংশ। এটি মেক্সিকোর তুলনামূলকভাবে ধনী অংশ হলেও, এখানকার বাসিন্দারা দেয়ালের উত্তর দিকের (নোগালেস অ্যারিজোনা) তুলনায় যথেষ্ট দরিদ্র। সন্ত্রাসী এবং অপরাধ কার্যকলাপের জন্য সেখানে অবস্থিত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো তাদের বাণিজ্যিক কার্যকলাপ ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারে না। গত ২০ বছর মেক্সিকোয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উন্নতি হলেও নির্বাচনের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের অপসারণ করা অনেক কঠিন।
একই শহরের এ দুটি অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু ঠিক একই রকম। এমন নয় যেন একটি শীতপ্রধান দেশ আরেকটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয়, যা বাসিন্দাদের কর্মক্ষমতা প্রভাবিত করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে, উত্তর অঞ্চলটি (নোগালেস অ্যারিজোনা) একসময় মেক্সিকোরই অংশ ছিল। তাই শহরের আদি বাসিন্দারা আদতে মেক্সিকান। অর্থাৎ বর্তমান প্রজন্মের অনেকের পূর্বপুরুষ মেক্সিকান বা জেনেটিক্যালি একই। এ ছাড়া সাংস্কৃতিতে রয়েছে অনেক মিল। এ দুই পাশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস প্রায় একই রকম।
এতদসত্ত্বেও, একই শহরের দেয়ালের দুই পাশের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার এত পার্থক্য নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন প্রচলিত আইনকানুনের (ইনস্টিটিউশন) পার্থক্যের দৃষ্টিকোণ থেকে। দেয়ালের উত্তরে বসবাসকারী (নোগালেস অ্যারিজোনা) লোকেরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাস করে, যা তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, দেয়ালের দক্ষিণের অধিবাসীরা এতটা ভাগ্যবান নয়। তারা এমন এক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করে, যা তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে না। বরং, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং প্রচলিত আইনের শাসন এ অঞ্চলের মানুষের স্বীয় সম্ভাবনা সীমিত করে দেয়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন যে, বিভক্ত শহর নোগালেসের দুই পাশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিন্নতা ব্যতিক্রম কোনো বিষয় নয়, বরং এটি দুই অঞ্চলের প্রচলিত ইনস্টিটিউশনের পার্থক্যের ফল।
ড্যারন অ্যাসেমোগলু, সাইমন জনসন এবং জেমস রবিনসন উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রাপ্ত গবেষণার ফলে দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ইনস্টিটিউশনের গুরুত্ব রয়েছে। একটি দেশে কীভাবে ইনস্টিটিউশনের উদ্ভব ঘটে, কেন প্রবৃদ্ধি বিনাশকারী ইনস্টিটিউশন বাস্তবায়িত হয় ও টিকে থাকে এবং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এমন ইনস্টিটিউশন কীভাবে পরিবর্তন করে উন্নয়নমুখী ইনস্টিটিউশনের উন্মেষ ঘটানো যায়—এমন সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় এবারের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের গবেষণার মাধ্যমে। অর্থনীতির প্রয়োজনীয় নীতিনির্ধারণে তাদের এই অসামান্য অবদানের জন্য নোবেল কমিটি তাদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করে।
লেখক: গবেষক, মাসকাট, ওমান
ইমেইল: [email protected]