কোনো কথা বা তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে সমাজে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি খুব সহজ। কেননা, মানুষ শোনা কথায় কান দেয় বেশি। আর তার সত্যাসত্য যাচাই বা মর্মার্থ অনুধাবনের চেষ্টা না করেই বিকৃত তথ্যের অবিকৃত প্রচার করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ লাভ করে, কখনো কখনো স্বার্থসিদ্ধিরও চেষ্টা করে। সমস্যা হলো, বিকৃত তথ্য ছড়ায় তাড়াতাড়ি। যেমন দ্রুত বাড়ে আগাছা-লতাপাতা। ছাড়ানো সে বিকৃত বা অসত্য তথ্যকে মানুষ বিশ্বাস করে খুব দ্রুত। ঠিক যেন চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে দৌড়ানো। আমাদের এই চিলের পেছনে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ানো অনেক সময় সমাজে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার সৃষ্টি করে। একটি ঘটনার কথা বলি। আমার এক ফুপাতো ভাই শেখ আমানুর বেশ কয়েক বছর প্যাকেজ নাটক বানিয়েছে। ওর কয়েকটি নাটকে আমার আরেক ফুপাতো ভাই লিটনদা অভিনয়ও করেছেন। বছরখানেক পরে দেখি আমানুরের নাটকে লিটনদাকে দেখা যায় না। একদিন ওকে বললাম, ‘কীরে লিটনদাকে যে আর দেখি না! তাকে পার্ট দিস না কেন?’ আমানুর বলল, ‘কীভাবে দেব, ক্যারেক্টার ভালো হতে হবে না?’ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে আমি বললাম, ‘দেখ, সেই ছেলেবেলা থেকে লিটনদাকে আমরা চিনি। কোনোদিন কোনো মেয়ের সঙ্গে ভালো করে কথাও বলেননি। এক ভাবিকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিলেন। আর তুই কি না বলছিস তার চরিত্র ভালো না!’ আমানুর আমার মাথায় একটা চাটি মেরে বলল, ‘আবে হালায় আমি হেইডা কইছি নি? কইছি দাদার অভিনয় করনের লাহান জুতসই চরিত্র পাইতে অইব না?’ আমানুর মাঝেমধ্যে খাস ঢাকাইয়া ভাষা ব্যবহার করে। আমি বললাম, ‘সেটা বুঝেছি। তবে আমি যদি এখন তোর এই কথাকে বিকৃত করে সবার কাছে বলি, আমানুর বলেছে, লিটনদার চরিত্র খারাপ, তাই তাকে নাটকে নেয় না, তাহলে কেমন হবে? মুহূর্তেই সবাই বিশ্বাস করবে দাদার চরিত্রে গোলমাল আছে।’ আমানুর মাথা দুলিয়ে সায় জানাল। ঠিক তেমনি পরিবেশিত বা প্রচারিত তথ্যের সত্যাসত্য যাচাই না করে বা তার প্রকৃত অর্থ না খুঁজে ততোধিক অপব্যাখ্যা করে প্রচার করা একশ্রেণির মানুষের খাসলতে পরিণত হয়েছে। তারা প্রচারিত তথ্যকে নিজেদের মনমতো ব্যাখ্যা করে ইথারে ছড়িয়ে দেয়। তাও আবার ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। ফলে সেসব কথা বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি মন্তব্য কেন্দ্র করে দেশের সামাজিকমাধ্যম এখন বেশ সরগরম। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন ড. ইউনূস। সেখানে ভয়েস অব আমেরিকাকে তিনি যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, তারই একটি অংশ নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। বলা হচ্ছে, ‘রিসেট বাটন’ চাপার কথা বলে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস মুছে ফেলার কথা বলেছেন। বিষয়টি এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, শেষ পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এর ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর দেওয়া সে ব্যাখ্যা ১১ অক্টোবর কালবেলাসহ প্রায় সব দৈনিকেই প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলেছে, “প্রধান উপদেষ্টা ‘রিসেট বাটন’ চাপার কথাটি উল্লেখ করে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি, যা বাংলাদেশের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে এবং কোটি মানুষের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার হরণ করেছে, সেটি থেকে বের হয়ে এসে নতুনভাবে শুরুর কথা বলেছেন। তিনি কখনোই বাংলাদেশের ‘গর্বিত ইতিহাস’ মুছে ফেলার কথা বলেননি।” প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, কেউ যখন কোনো ডিভাইসে রিসেট বোতাম চাপেন, তখন তিনি নতুন করে ডিভাইসটি চালু করতে সফটওয়্যার সেট করেন। এতে হার্ডওয়্যার পরিবর্তন হয় না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের হার্ডওয়্যার। ব্যাখ্যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ড. ইউনূস যে যুক্তরাষ্ট্রের মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ছিলেন এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ‘বাংলাদেশ সিটিজেনস কমিটি’ গঠন করে প্রচারণা চালিয়ে আমাদের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত সৃষ্টিতে অংশ নিয়েছেন, সে কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। (সূত্র: কালবেলা ১১ অক্টোবর, ২০২৪)।
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য এবং তার প্রেস উইংয়ের ব্যাখ্যা পাশাপাশি দাঁড় করালে এটা বোঝা যাবে, দুটির মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। তবে ‘বাংলাদেশের গর্বিত ইতিহাস’ না বলে ‘গর্বের ইতিহাস’ বলা অধিকতর যুক্তিযুক্ত হতো। কেননা সে ইতিহাস ধারণ করে আমরা গর্বিত। রিসেট বাটনের বিষয়টি সম্বন্ধে আমি যেহেতু সম্যক অবগত নই, তাই কম্পিউটার সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েশন করা আমার কন্যাটির কাছে তা জানতে চাইলাম। সে জানাল, যদি কেউ তার ডিভাইস থেকে কিছু মুছে ফেলতে চায় বা ডিভাইসকে নতুন করে সাজাতে চায়, তাহলে রিসেট বাটন চাপার প্রয়োজন হয়। তবে তার আগে মূল্যবান বা অতিমূল্যবান ডকুমেন্ট অন্য কোনো ডিভাইসে সংরক্ষণ করে নিলে তার কোনো ক্ষতি হয় না। তা ছাড়া সফটওয়্যারের ডকুমেন্ট রিমুভ হয়ে গেলেও হার্ডওয়্যারে তা থেকেই যায়, যা থেকে সেসব ডকুমেন্ট পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
এখন আসি ড. ইউনূসের বক্তব্যের রাজনৈতিক পর্যালোচনায়। ‘রিসেট বাটন’ চেপে বাংলাদেশের রাজনীতির কিছু কদর্য ও পচা অতীত মুছে ফেলার কথা বলে কি তিনি ভুল বা অন্যায় করেছেন? কে না জানে, গত জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশেকে দুর্নীতি, দুঃশাসন এবং অসত্য, বিকৃত ও মনগড়া ইতিহাসের ঘোরাটোপ থেকে মুক্ত করা। বিশেষত ওই স্বৈরাচারী সরকারটি গত দেড় দশকে জাতিকে তাদের রসুইঘরে রান্না করা ইতিহাসের যে জগাখিচুড়ি জবরদস্তি গেলাতে চেষ্টা করেছে, তার অবসান চেয়েছিল দেশবাসী। ওই সময় পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রী এবং তাদের বশংবদ বুদ্ধিজীবীদের কথাবার্তা শুনলে মনে হতো, বাংলাদেশের যা কিছু ইতিহাস-ঐতিহ্য তার শুরুটা বোধহয় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। এর আগে এ জাতির কোনো ইতিহাস ছিল না, ঐতিহ্যও ছিল না। ১৫টি বছর জাতিকে শুনতে বাধ্য করা হয়েছে, লীগ দলীয় ল্যাবরেটরিতে তৈরি ইতিহাস। সেই বিকৃত ইতিহাসকে যদি কেউ মুছে ফেলে প্রকৃত ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরতে চায়, তাহলে কি তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে?
একই সঙ্গে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, তার অবসান চেয়েছে প্রতিটি শান্তিপ্রিয় নাগরিক। একটি দল জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল এ দেশের ওপর। সে পাথরের নিচে চাপা পড়েছিল মানুষের মৌলিক-মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। হরণ করা হয়েছিল ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে করা হয়েছিল রুদ্ধ। ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয় ও অনুপ্রেরণায় চূড়ান্ত অবক্ষয়ের কবলে পড়েছিল মূল্যবোধ। সমাজ চলে গিয়েছিল দুর্বৃত্ত-দুষ্কৃতকারীদের কবজায়। ভালো মানুষদের জায়গা ছিল না কোথাও। এমনকি ইজ্জত-সম্মান সহকারে বসবাস হয়ে পড়েছিল দুঃসাধ্য। একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ গোটা বাংলাদেশে বিরাজমান ছিল ৪ আগস্ট পর্যন্ত। ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে সে ভয়ংকর পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে। আর তা ঘটেছে শিক্ষার্থী-জনতার রিসেট বাটন চাপার কারণেই। ফল সে রিসেট বাটন যে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর গাত্রদাহ সৃষ্টি করে থাকবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
আজ যারা ড. ইউনূসের রিসেট বাটন নিয়ে কূটতর্কের অবতারণা করার চেষ্টা করছেন, গত ১৫ বছর তারা কিছু হলেই চিৎকার করেছেন ‘স্বাধীনতা গেল’ ‘স্বাধীনতা গেল’ কোরাস গেয়ে। লীগ সরকারের বিরোধিতা করাকে তারা স্বাধীনতার বিরোধিতা বলে শোর তুলতেন। বলতেন, বিএনপি-জামায়াত ষড়যন্ত্র করছে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর। সে সময় বেশ কয়েকবার টিভি টকশোতে আমি বলেছিলাম, রসায়ন শাস্ত্রমতে, বস্তুর পরিবর্তন দুই প্রকার। এক. ভৌত পরিবর্তন; দুই. রাসায়নিক পরিবর্তন। ভৌত পরিবর্তনে বস্তুর আকার-আকৃতি ও অবস্থানের পরিবর্তন হলেও মৌলিকত্বের কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন পানি থেকে বরফ তৈরি হয়, আবার বরফ গলিয়ে পানিতে রূপান্তর করা যায়। সে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে শীতল করে পুনরায় পানিতে পরিণত করা যায়। এখানে পানির শুধু আকার-আকৃতি ও অবস্থানের পরিবর্তন হয়, মৌলিকত্বের কোনো পরিবর্তন হয় না। অন্যদিকে দুধ দিয়ে দই, ক্ষীর কিংবা চা তৈরি করা যায়। এত দুধের রং, স্বাদ ও প্রকৃতির যে পরিবর্তন হয়, তাতে সেটাকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। এটাই রাসায়নিক পরিবর্তন। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তন ঘটে, বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলে ‘রাসায়নিক বিক্রিয়া’। আমার বিবেচনায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হলো রাসায়নিক বিক্রিয়া। সে বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থটি হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ফলে হাজারো চেষ্টা করেও এটাকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না, মানে পাকিস্তান বানানো যাবে না। আমার এ ব্যাখ্যা শুনে লীগ-দলীয় ‘মর্দে মুমিন’ অনেক ‘বাঘ-সিংহ’ চুপ মেরে যেতেন। তারপরও বলতেন, বিএনপি স্বাধীনতা বিনষ্ট করতে চায়। কিন্তু কীভাবে করতে চায় স্পষ্ট করে বলতে পারতেন না।
স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে, তাদের পালের গোদারা কেউ পালিয়ে গেছে, কেউ আছে গারদের অন্তরালে। তার মানে এই নয় যে, তাদের অনুচর এবং তল্পিবাহক কথিত বুদ্ধিজীবীরা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। তারা নানা বেশে নানা স্থানে অবস্থান করছে। আর মওকা খুঁজছে দেশে একটি ভজঘট লাগানোর। একটু ছুতানাতা পেলেই হৈচৈ বাধিয়ে দিতে চেষ্টা করবে। তাই সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ড. ইউনূস যেহেতু পেশাদার রাজনীতিবিদ নন, তাই কথার মারপ্যাঁচ তিনি নাও বুঝতে পারেন। এজন্য তার চারপাশে যারা আছেন, তাদের সতর্ক থাকতে হবে। যাতে মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো সরলবাক্য বা উক্তির বিকৃত ব্যাখ্যা করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ফায়দা লোটার চেষ্টা না করতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক