মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৫, ০৮:০৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ

প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ

বাংলাদেশের গর্ব এবং অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আজ প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বজুড়ে প্রায় এক কোটি সংখ্যায় অবস্থান করছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা এ জনগোষ্ঠী শুধু দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করছেন না, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। এ বিপুল অবদানের বিপরীতে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকাটা গণতান্ত্রিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধু অবহেলার ফল, নাকি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ঘাটতি?

দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে নীতিগত আলোচনা চললেও, আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তবে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন, তা আশাবাদের নতুন দ্বার খুলেছে। নির্বাচন কমিশনও ‘প্রক্সি ভোট’, ‘পোস্টাল ব্যালট’ ও ‘অনলাইন ভোটিং’ পদ্ধতি বিবেচনা করে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

ভোটাধিকার কোনো করুণা নয়, এটি নাগরিকের একটি সাংবিধানিক অধিকার। অথচ বাস্তবে প্রবাসীরা এখনো ভোটাধিকার প্রয়োগের বাইরে রয়েছেন। ২০২৪ সালের প্রবাসী দিবসে ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য, ‘প্রবাসীদের ভোটাধিকার এখন সময়ের দাবি’—এ ঘোষণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে তার অন্তরালে রয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নীতিনির্ধারকদের দ্বিধা ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।

বাংলাদেশের প্রচলিত ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’-এ প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ধারা নেই, যা একটি বড় আইনি অন্তরায়। দ্রুত এ আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রবাসীদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পথ সুগম করতে হবে। বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশের প্রবাসীরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, ভারত, মেক্সিকো, পাকিস্তান এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ায়ও প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ ভোটারের চেয়ে বেশি প্রবাসী ভোট প্রদান করেছে—এ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন তিনটি সম্ভাব্য মডেল বিবেচনায় নিচ্ছে—প্রক্সি ভোট, পোস্টাল ব্যালট ও অনলাইন ভোটিং। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, ‘প্রক্সি ভোট’ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও বাস্তবায়নযোগ্য। তবে পদ্ধতি নির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজন আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামোর উন্নয়ন এবং দূতাবাসগুলোকে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা দিতে সক্ষম করা।

প্রবাসীরা শুধু অর্থনীতির প্রাণ নয়, তারা দেশের সংকটে মানববন্ধন করেন, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন এবং নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন। অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে নির্বাচনে, তাদের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখন অনলাইন ভোটিং কোনো দুরূহ বিষয় নয়। ইচ্ছা ও অঙ্গীকার থাকলে, অনলাইন বা পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে সহজেই বিশ্বজুড়ে বসবাসরত প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে প্রয়োজন কয়েকটি সুসংহত উদ্যোগ—

আইনি সংস্কার: আরপিও-১৯৭২ সংশোধন করে প্রবাসীদের ভোটার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা; প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি: নিরাপদ অনলাইন বা হাইব্রিড পদ্ধতির নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; দূতাবাসের সম্পৃক্ততা: ভোটার তালিকাভুক্তি, তথ্য যাচাই ও ভোটকেন্দ্র স্থাপনে দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় করা; পাইলট প্রকল্প: প্রাথমিকভাবে কয়েকটি দেশে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন বা পোস্টাল ভোটিং চালু করে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া।

বিশ্বের অনেক দেশ যখন প্রবাসীদের ভোটাধিকারকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখছে, তখন বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? প্রবাসীদের নির্বাচনী অন্তর্ভুক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, রাষ্ট্র ও প্রবাসী জনগণের মধ্যকার আস্থার সেতুবন্ধ দৃঢ় করবে।

সুতরাং, এখন সময় এসেছে প্রবাসীদের ভোটাধিকারকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে রূপ দেওয়ার। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচন কমিশন, আইন প্রণেতা ও সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ ভোটাধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার—আর এ অধিকার নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কর্তব্য।

লেখক: দুবাই প্রতিনিধি, দৈনিক কালবেলা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে ইসরায়েল : ট্রাম্প

যশোরে আ.লীগ-যুবলীগের তিন নেতা গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার পদত্যাগ

নিখোঁজের ৪ দিন পর প্রবাসীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ক্যানসার শনাক্তে দেশে প্রথম রোবটিক প্রোস্টেট বায়োপসি হলো স্কয়ারে

আমার কথা বলে তাহেরী হুজুর আলোচনায় থাকতে চান : সামান্তা

অভিষেক ম্যাচেই ৪৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ভারতীয় ক্রিকেটার 

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলায় ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

১০

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

১১

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

১২

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

১৩

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৪

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

১৫

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

১৬

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১৭

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১৮

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১৯

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

২০
X