চলমান অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থায়ন তথা রাজস্ব আদায়। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট প্রাপ্তি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৯ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া এনবিআরবহির্ভূত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১৯ হাজার কোটি এবং কর ছাড়া প্রাপ্তির (এনটিআর) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ বা আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার কমছে ৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে নজিরবিহীন শিথিলতা অবলম্বনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতি যখন করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে উঠছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যা বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত করে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং আমেরিকা ও চীনসহ বহুপক্ষীয় বাণিজ্যযুদ্ধ বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্য প্রসারে বিরাট এক অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপীই বিশেষ করে ২০২২ সালের পর থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যদিও আমাদের পার্শ্ববর্তী কিছু দেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশই বর্তমানে মূল্যস্ফীতির এ চাপ অনেকটাই সামলে নিয়েছে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত সরকারের ভ্রান্ত রাজস্ব ও মুদ্রানীতিই আমাদের দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য পুরোপুরিভাবে দায়ী। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, কুচক্রী মহলের পরামর্শে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়মতো পর্যাপ্তভাবে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অবলম্বন না করা এবং সরকারের রাজস্বনীতিতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন করে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়িয়ে সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারার কারণেই সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছে।
আশার কথা এই যে, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী ড. আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর এরই মধ্যে কয়েক দফায় ব্যাংকের নীতি সুদহার বাড়িয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি কতটা আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন এবং প্রয়োজনে নীতি সুদহার আরও বৃদ্ধির বার্তাও দিয়ে রেখেছেন। অর্থনীতির তাত্ত্বিক ধারণা অনুযায়ী, নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং আমাদের দেশে এ অপেক্ষার সময় সাত থেকে নয় মাস পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের রাজস্বনীতিতে বাজেটের ঘাটতি হ্রাস এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে পর্যাপ্ত ব্যয় বাড়ানোরও কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ সরকারকে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমাতে হবে, অন্যদিকে তেমনি কর্মসংস্থানমুখী উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় ও রাজস্ব আয় বাড়াতে উদ্যমী ভূমিকা পালন করতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, গণঅভ্যুত্থানে পতিত সরকার জাতীয় সংসদে যে বাজেট পাস এবং বাস্তবায়ন শুরু করে গেছে, সেখানে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রক্ষেপিত বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৯২ হাজার কোটি থেকে কমিয়ে ৭ লাখ ৯৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা সত্ত্বেও উন্নয়ন বাজটের প্রায় সম্পূর্ণটাই ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে গেছে। এমনকি অপ্রদর্শিত আয়কে মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার অনৈতিক চেষ্টার পরও উন্নয়ন বাজেটের প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে গত সরকার, যদিও অন্তর্বর্তী সরকার অপ্রদর্শিত আয়কে বৈধ করার বিধান বাতিল এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্থগিত রাখার বিষয়ে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনবলের সীমাবদ্ধতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারের রাজস্ব আয়ের আওতা বাড়াতে কর এজেন্ট নিয়োগের বিষয়টি সাম্প্রতিককালে বেশ আলোচিত হলেও এর তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। কর এজেন্ট নিয়োগের বিষয়টি কিছুটা আইনি কাঠামোর সঙ্গে জড়িত বিধায় এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত বলে ধারণা করা যায়। এ ছাড়া কর এজেন্ট নিয়োগ দিলে অভিজ্ঞতার বিচারে কর বিভাগের সাবেক কর্মকর্তাদেরই এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে আয়কর বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা অনৈতিক যোগসাজশ সৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এজেন্ট নিয়োগ করতে গেলে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত স্বীকৃতি/গ্যারান্টি দিতে হতে পারে। তাই এ দীর্ঘসূত্রতা ও নানা জটিলতা পরিহার করে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় বাড়াতে অস্থায়ী ও পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে এনবিআরের অধীনে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা ভেবে দেখা যেতে পারে। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের আওতায় প্রতি আয়কর বছরের সেপ্টেম্বর হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বা সুবিধাজনক অন্য কোনো সময়ে তিন-চার মাসের জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়েকে বা শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে উপজেলা/এলাকাভিত্তিক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে মাঠপর্যায়ে নতুন আয়কর দাতা ও ভ্যাট প্রদানকারী খুঁজে বের করা ও তাদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে টিন নম্বর প্রদান, রিটার্ন ফরম পূরণ ও দাখিলের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং স্বেচ্ছায় প্রদত্ত কর আদায় শেষে তৎক্ষণাৎ আয়কর সনদ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের সুনির্দিষ্ট কিছু স্থানে আয়কর মেলা আয়োজনের মাধ্যমে এ ধরনের সেবা প্রদান করা হলেও, সেখানে নতুন করদাতারা যেতে খুব একটা আগ্রহ দেখান না।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় কর সেবাকে ভ্রাম্যমাণ করে মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে শুধু নতুন করদাতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায় এবং এ প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত লোকবলের দৈনিক মজুরি/বেতন-ভাতাকেও তাদের পারফরম্যান্সের সঙ্গে বা নতুন করদাতা শনাক্তকরণ ও তাদের দ্বারা শনাক্তকৃত নতুন করদাতার কাছ থেকে কর আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা যায়। এতে একদিকে যেমন ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে করের আওতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে দেশে কর প্রদান বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবলের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। আবার মহৎ এ কাজে অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষিত বেকার জনগণও অল্প কিছুদিন কাজ করে তাদের লেখাপড়া বা জীবন-জীবিকার একটা বড় অংশ নিজেরাই বহন করার পথ খুঁজে পাবে। তবে অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত লোকবলের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম স্থানীয় প্রশাসন ও আয়কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এমনভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, যাতে তারা জোরপূর্বক কর আদায় করে সরকারের ভাবমূর্তি কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না করে। এ ছাড়া এই ধরনের প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শুরুর আগেই জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানোরও প্রয়োজন হবে।
বিগত সরকারের আর্থিক খাতের ব্যাপক দুর্নীতি ও ভ্রান্ত এবং অপরিণামদর্শী রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কারণে বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোয় নগদ তারল্যের অভাব ও মুদ্রাবাজারে সুদের হারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা সৃষ্টি হয়েছে। তারল্য সংকটের পাশাপাশি দেশে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় আবশ্যিকভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংককে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির আশ্রয় নিতে হচ্ছে। তবে এমন সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির মধ্যেও ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমন মুনশিয়ানা দেখাতে হবে, যাতে দেশের সার্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি ও ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ হ্রাস এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে গতানুগতিক পথে না হেঁটে প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রসার ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ছাত্র ও বেকার জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে রাজস্ব আয় বাড়াতে অস্থায়ী ও পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে এনবিআরের অধীনে পরীক্ষামূলকভাবে এ নিবন্ধে বর্ণিত প্রকল্প গ্রহণও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক: সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন
মন্তব্য করুন