আজকের বিশ্বে কোনো দেশ চাইলে স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না, যদি তার হাতে ডলারের জোগান না থাকে। তেল কিনতে হোক, ঋণ শোধ করতে হোক বা আমদানি-রপ্তানির চাকা ঘোরাতে হোক—সবখানেই ডলারের ছায়া। অথচ এ আধিপত্য কি চিরস্থায়ী? ইতিহাস বলে, যে কোনো ‘অপরাজেয় শক্তি’র পতন একদিন হবেই। প্রশ্ন হলো, ডলারের রাজত্ব কি সেই পথে হাঁটছে? নাকি আরও শক্ত শিকড় গাড়ছে বিশ্ব অর্থনীতির মাটিতে?
ডলারের আধিপত্য কেন : বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির মধ্যে মার্কিন ডলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এটিকে ‘বিশ্বের রাজার মুদ্রা’ বলা হয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর কারণ। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি ও আকার এত বিশাল যে, বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এটি এক ধরনের আস্থার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার ও ব্যাংক ব্যবস্থা এতটাই উন্নত ও নির্ভরযোগ্য যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান তাদের টাকা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। মার্কিন অর্থনীতির গতিশীলতা ও বাণিজ্যিক পরিবেশ ডলারের গুরুত্বকে আরও পোক্ত করে। এরপর, অনেক দেশ নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বড় পরিমাণে ডলার রিজার্ভ হিসেবে জমা রাখে। এই মজুত অর্থ বা ‘মুদ্রা রিজার্ভ’ এক ধরনের আর্থিক বীমা; ব্যবসা-বাণিজ্যের সময় দরকার হলে তা ব্যবহার করে লেনদেন বা মুদ্রার অবমূল্যায়ন থেকে সুরক্ষা নেয়। ফলে ডলারকে শুধু একটি মুদ্রা হিসেবে না দেখে, অনেক দেশ এটিকে তাদের জাতীয় অর্থনীতির রক্ষাকবচ মনে করে। এই ব্যাপক মজুতই ডলারের মূল্যমান ও গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় বড় পণ্য যেমন তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের দাম নির্ধারণে ডলারের ব্যবহার। এই পেট্রোডলারের যুগে, প্রায় সব তেল বিক্রেতা দেশ তেল বিক্রির জন্য ডলারেই দাম চায়। এ অবস্থায় ডলার ছাড়া বিশ্ববাজারে পণ্যের লেনদেন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই বিশ্বের অনেক দেশ বাধ্য হয় ডলার সংগ্রহ করতে এবং নিজেদের বাণিজ্য কার্যক্রম চালাতে। সবশেষে, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের কথা উল্লেখ না করলে হবে না। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণপত্র, যেগুলোকে সারা বিশ্বে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করা হয়। দেশ, কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীরা এই বন্ড কিনে তাদের অর্থ সুরক্ষিত রাখে এবং সেখান থেকে নিয়মিত সুদ পায়। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের এ নিরাপত্তা ডলারের প্রতি বিশ্বস্ততা তৈরি করে, যা আর্থিক বাজারে ডলারের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। এসব একত্রে ডলারের আধিপত্যের ভিত্তি গড়ে তোলে। মার্কিন অর্থনীতির শক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা, বিশ্বব্যাপী মুদ্রা রিজার্ভ এবং নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ ডলারের স্থিতিশীলতা ও প্রাধান্য নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে ডলার বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।
ডলার এখনো কেন শাসন করছে : ডলারের জায়গায় অন্য কোনো মুদ্রা আসবে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর হলো, এখনো তেমন কোনো স্থিতিশীল মুদ্রা নেই। উদাহরণস্বরূপ, ইউরো অনেক দেশের যৌথ মুদ্রা হলেও ইউরো অঞ্চল বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে লড়ে যাচ্ছে। এ কারণে ইউরো পুরোপুরি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। অন্যদিকে, চীনের মুদ্রা রেনমিন্বি বা ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো সম্পূর্ণরূপে মুক্ত এবং স্বচ্ছভাবে বাণিজ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে না। অর্থাৎ, রেনমিন্বি এখনো অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, যার কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখনো বেশি আস্থা রাখে ডলারে। এ কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের বিকল্প হিসেবে এখনো কোনো মুদ্রা পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায়নি এবং ডলারের আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা : অনেক ছোট বা উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি অনেক সময় খুবই দুর্বল এবং তাদের নিজস্ব মুদ্রার মান অনেক বেশি অস্থিতিশীল থাকে। অর্থাৎ, তাদের মুদ্রার দাম বাজারে ওঠানামা করে অনেক দ্রুত। ফলে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ নেওয়ার সময় তাদের নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। কারণ তাদের মুদ্রার মূল্য হঠাৎ কমে গেলে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে এ ধরনের দেশগুলো সাধারণত ডলারে ঋণ নেয় বা তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলার ব্যবহার করে। ডলার অন্য মুদ্রার তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল ও বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য। তবে এতে সমস্যা হচ্ছে, যখন ডলারের মান ওঠানামা করে তখন ওই দেশের অর্থনীতি সরাসরি প্রভাবিত হয়। যেমন, ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে তাদের ঋণের বোঝা বেড়ে যায়, আমদানি ও রেমিট্যান্স খরচ বাড়ে আর অর্থনীতি কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং ডলারের ওপর নির্ভরতা অনেক ছোট বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনা: বর্তমানে বিটকয়েন, ইথেরিয়াম ইত্যাদি ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রাগুলো অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলো কম্পিউটার কোডের মাধ্যমে তৈরি হয় এবং কোনো কেন্দ্রীয় সরকার বা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অনেকের মনে হয়, ভবিষ্যতে এ ডিজিটাল মুদ্রাগুলো ডলারের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। কারণ এগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহার করা যায়, মাঝামাঝি কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয় না এবং লেনদেন অনেক দ্রুত হয়। তবে এখনো বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, মুদ্রাগুলোর মূল্য খুব বেশি ওঠানামা করে, যা অনেক সময় বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। দ্বিতীয়ত, অনেক দেশ এখনো মুদ্রাগুলোর ব্যাপারে পরিষ্কার আইন বা নিয়ম তৈরি করেনি। তাই এগুলোকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে পুরোপুরি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এখনো সীমিত। বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সি ডলারের বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলেও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে এবং এতে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে? : বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে ডলারের আধিপত্য কিছুটা কমে আসতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে বহু মুদ্রাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, শুধু ডলার নয়, ইউরো, রেনমিন্বি এবং অন্যান্য মুদ্রাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এবং বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। এতে ডলারের একক আধিপত্য কিছুটা দুর্বল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেড়ে চলেছে। যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) প্রবর্তন। এসব নতুন ধরনের মুদ্রা আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে পরিবর্তন আনতে পারে, যার ফলে ডলারের প্রভাব কমতে পারে। তৃতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চাইছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। তারা নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে ডলারের প্রভাব কমে। BRICS-এর মধ্যে ডলার নির্ভরতা কমানো নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে—ভারত স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যে জোর দিচ্ছে। ট্রাম্প ১০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেও ব্রাজিল, চীনসহ নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারে অটল থেকেছেন। বৈশ্বিকভাবে ডলারের আধিপত্য কিছুটা নড়বড়ে হলেও তা দ্রুত হারাবে না; ধীরে ধীরে বহুমুদ্রা ব্যবস্থার দিকে অগ্রগতি হচ্ছে। তবে ডলারের প্রভাব একেবারে শেষ হয়ে যাবে না। কারণ এটি এত বিস্তৃতভাবে ব্যবহৃত এবং বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য যে, এর আধিপত্য দ্রুত হারানো কঠিন। অর্থনৈতিক কাঠামো, বাণিজ্য চুক্তি, আর্থিক বাজার এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালায় ডলারের জায়গা সহজে বদলানো যাবে না। তাই সামান্য হলেও ডলার ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হিসেবে থেকে যাবে।
বাংলাদেশের করণীয়: বাংলাদেশ আজ যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার একটি বড় কারণ হলো ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ, রিজার্ভ সংকট কিংবা মুদ্রাস্ফীতির মতো সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িত, আর এর কেন্দ্রে রয়েছে ডলার। তাই শুধু স্বল্পমেয়াদি সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও সুসংহত পরিকল্পনা জরুরি।
ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এক বিশাল শক্তির প্রতীক। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু আর্থিক নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও বিস্তার করে। অনেক দেশ তাদের বাণিজ্য ও ঋণদানের ক্ষেত্রে ডলারের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের জন্য সুবিধাজনক, কারণ এটি একটি স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য মুদ্রা। তবে এই নির্ভরতা একই সঙ্গে ঝুঁকিও বহন করে। ডলারের মূল্য ওঠানামা বা মার্কিন নীতির পরিবর্তনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশেষত বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে যখন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলো আরও দ্রুত ও ব্যাপক হবে, তখন ডলারের অবস্থান কী রকম হবে, সেটা দেখতে হবে খুব সতর্কতার সঙ্গে। এ পরিবর্তনগুলোর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হবে, তাই ডলারের স্থান নিয়ে সচেতন থাকা সময়ের দাবি।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন