ড. ইকবাল আহমেদ
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো!

ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো!

ডিজিটাল মানব হওয়ার দৌড়ে আমরা এখন আর শুধু মানুষ নই, আমরা এখন কনটেন্ট। আর সেই কনটেন্টের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী হলো আমাদের প্রিয় সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক। একসময় যাকে বলা হতো ‘ভার্চুয়াল স্পেস’, আজ তা এতটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে যে, পাবলিক আর প্রাইভেটের মাঝখানের সীমারেখা প্রায় মুছে গেছে। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি ফেসবুক ব্যবহার করছি, নাকি ফেসবুকই আমাদের ব্যবহার করছে? এ দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও কৌতুককর ও একই সঙ্গে উদ্বেগজনক। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আগে আয়নায় মুখ দেখা হয় না, দেখা হয় ফেসবুকের নিউজফিডে। কে কী খেল, কে কোথায় গেল, কার সংসারে ঝামেলা, কার বাচ্চা আজ কী খেয়েছে—সবই এখন ‘পাবলিক নলেজ’। ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো যেন আর ব্যক্তিগত নেই; বরং লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের মাপকাঠিতে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয়।

একসময় ব্যক্তিগত দুঃখ ছিল ঘরের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ। এখন দুঃখও স্ট্যাটাস হয়—‘মনটা আজ খুব খারাপ’—এরপর অপেক্ষা, কে কতটা সমবেদনা জানাল। কেউ যদি কমেন্ট না করে, তাহলে দুঃখটা যেন আরও বৈধতা হারায়। সুখের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিয়ে, জন্মদিন, সন্তান জন্ম; এমনকি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও এখন ‘লাইভ আপডেট’। মনে হয়, ফেসবুক ছাড়া এসব ঘটনা ঘটলেই-বা তার অস্তিত্ব কী?

এ দেশের বাস্তবতায় ফেসবুক এখন আর নিছক একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক আদালত। একটি স্ট্যাটাস, একটি পুরোনো ছবি বা পাঁচ বছর আগের কোনো মন্তব্য—এ সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার পূর্ণাঙ্গ উপকরণ তৈরি হয়ে যায়। কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী; কে প্রগতিশীল, কে প্রতিক্রিয়াশীল; এসব রায় অনেক সময় দেওয়া হয় একটি স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে। প্রমাণের দরকার নেই, প্রসঙ্গ বোঝার প্রয়োজন নেই; দরকার শুধু ভাইরাল হওয়ার মতো একটি বাক্য।

ব্যঙ্গের বিষয় হলো, আমরা নিজেরাই এ বিচারব্যবস্থার স্বেচ্ছাসেবী জজ! সকালে ঘুম থেকে উঠে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা কারও চরিত্র বিশ্লেষণ করে ফেলি, ‘এই লোক তো ফেসবুকে এটা লিখেছে, নিশ্চয়ই ওর মানসিকতা এমনই।’ বাস্তব জীবনে তার কাজ, অবদান, আচরণ—এসব গৌণ। ফেসবুক স্ট্যাটাসই হয়ে ওঠে মানুষের পূর্ণাঙ্গ সিভি। ফলে সমাজে তৈরি হয় এক ধরনের ডিজিটাল লেবেলিং কালচার, যেখানে মানুষকে বোঝার চেয়ে ট্যাগ লাগানোই সহজ।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এ প্রবণতা আরও বিপজ্জনক। একটি রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ মানেই এখন ঝুঁকি নেওয়া। স্ট্যাটাসের শব্দচয়ন ঠিক না হলে আপনি রাতারাতি ‘বিপজ্জনক’, ‘বিকৃত’ বা ‘এজেন্ডাবাজ’ হয়ে উঠতে পারেন। রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গায় যুক্তি নয়, চলে ব্যক্তিগত আক্রমণ। মতের সঙ্গে দ্বিমত করার বদলে মানুষকে হেয় করাই যেন প্রধান কৌশল। গণতন্ত্রের মৌলিক চর্চা হচ্ছে সহনশীলতা—এ ডিজিটাল কোলাহলে হারিয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন আসে, উন্নত দেশগুলো কি সত্যিই ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র চালায়, বিচার করে? উত্তরটা খুব সোজা—না। সেখানে সামাজিক মাধ্যম আছে, বিতর্ক আছে; এমনকি তীব্র মতবিরোধও আছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিক মূল্যায়ন বা নীতিনির্ধারণের ভিত্তি কখনোই ফেসবুক পোস্ট নয়। উন্নত দেশগুলোতে নীতিনির্ধারণ হয় গবেষণা, তথ্য, পরিসংখ্যান এবং প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যম সেখানে মতপ্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র—রাষ্ট্রের বা বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়।

তাদের পার্থক্যটা এখানেই। সেখানে নাগরিকের প্রাইভেট স্পেসকে আইন ও সামাজিক রীতিনীতি দুভাবেই সম্মান করা হয়। একজন মানুষ কী ভাবছে, তা জানার অধিকার সবার আছে; কিন্তু সে ভাবনাকে টেনে এনে জনসমক্ষে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বানানো হয় না—যতক্ষণ না তা আইন ভাঙছে। আমাদের দেশে সেই সূক্ষ্ম পার্থক্যটাই বারবার উপেক্ষিত হয়। ফলে ফেসবুক হয়ে ওঠে সামাজিক উত্তেজনা তৈরির কারখানা।

এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায় শুধু ব্যবহারকারীর নয়; নীতিনির্ধারকদেরও বড় ভূমিকা আছে। প্রথমত, ডিজিটাল লিটারেসিকে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক ও সামাজিক মাত্রা যোগ করতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়েই শেখাতে হবে—কী শেয়ার করা উচিত, কী ব্যক্তিগত থাকা জরুরি এবং অনলাইনে ভিন্নমতকে কীভাবে সম্মান করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল অধিকার ও প্রাইভেসি নিয়ে স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। আইন এমন হতে হবে, যা অপব্যবহার রোধ করবে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করবে না। অস্পষ্ট ও ভীতিকর আইন মানুষকে দায়িত্বশীল করে না; বরং তাকে আরও আক্রমণাত্মক বা আত্মসংযত—দুই চরমে ঠেলে দেয়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফেসবুকের বাইরে শক্তিশালী যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব ব্যাখ্যা, সব সিদ্ধান্ত যদি ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই এ প্ল্যাটফর্মকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে দেয়। উন্নত দেশগুলো এখানেই সচেতন যে, সোশ্যাল মিডিয়া সহায়ক, বিকল্প নয়।

সবশেষে আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও একটি প্রশ্ন করা জরুরি, ‘আমরা কি সত্যিই ডিজিটাল মানব হতে চেয়েছিলাম, নাকি শুধু অনিরাপদ এক দর্শক, যে অন্যের জীবন স্ক্রল করতে করতে নিজের বিবেক হারিয়ে ফেলেছে?’ ফেসবুক আমাদের হাতিয়ার হতে পারত; কিন্তু আমরা তাকে বিচারক বানিয়ে ফেলেছি। পাবলিক আর প্রাইভেট স্পেসের এ ব্লারিং চলতে থাকলে একদিন হয়তো আবিষ্কার করব—আমাদের সমাজ খুবই কানেক্টেড, কিন্তু ভীষণভাবে বিভক্ত!!

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিয়ের অনুষ্ঠানে মসজিদে খেজুর ছিটানো যাবে কি

প্রচুর রাগ হলেও শাকিবই আমার রাগ ভাঙায়: বুবলী

তামিম-মোসাদ্দেকে ভর করে অজিদের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য ছুড়ে দিল টাইগাররা

বিতর্কের মুখে ‘পেদ্দি’ থেকে মুছল জাহ্নবীর আবেদনময়ী দৃশ্য

একনেকে ৩৮৯১ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন, আটকে গেল খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প

১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা সমর্থকের ব্রাজিলে যোগদান

ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে সঙ্ঘবদ্ধ ‘ধর্ষণ’

বছরে কতবার পরিষ্কার করা হয় মসজিদে নববী?

আত্মসমর্পণের পর পাঁচ আ.লীগ নেতা কারাগারে

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা নিহত

১০

একনেকে ১০ প্রকল্প অনুমোদন

১১

কিউবায় ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

১২

পরম আমাকে বিয়ে করেনি বলে তাদের ভীষণ দুঃখ: রাইমা

১৩

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু

১৪

আ.লীগ নেতা রানা গ্রেপ্তার

১৫

দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা, বহু হতাহত

১৬

পাবনায় ধর্ষণ-হত্যার জেরে আসামিদের বাড়িতে আগুন, নিহত ৩

১৭

নতুন কিছু করার অঙ্গীকার শি-কিমের

১৮

চার বছর পর ফিরেই মোসাদ্দেকের ফিফটি

১৯

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর মাকে ধর্ষণের অভিযোগ

২০
X