প্রভাষ আমিন
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৪২ এএম
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৫৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় ‘সাবালক’ পার্টি!

জাতীয় ‘সাবালক’ পার্টি!

নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে তখনকার সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। পূর্বসূরি জিয়াউর রহমানের দেখানো পথ ধরে এরশাদও ক্যান্টনমেন্টে থেকেই রাজনীতি শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠিত হয় জাতীয় পার্টি। ’৮৬ ও ’৮৮ সালের নির্বাচনে এরশাদের নেতৃত্বে জিতেও যায় জাতীয় পার্টি। কিন্তু ’৯০-এ গণআন্দোলনের মুখে এরশাদের পতনের পর রাজনৈতিকভাবে পতন ঘটে তার দলেরও। তবে জাতীয় পার্টি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। বরং কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতিতে এখনো টিকে আছে দলটি।

প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছর পর কাগজে-কলমে জাতীয় পার্টি এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল। বিএনপির অনুপস্থিতিই জাতীয় পার্টিকে প্রধান বিরোধী দলের সম্মান দিয়েছে। তবে সবাই তাদের ডাকে ‘গৃহপালিত বিরোধ দল’। তাই তাদের অর্জন যতটা না সম্মানের, তার চেয়ে বেশি গ্লানির। অবশ্য প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছর পর জাতীয় পার্টির মহাসচিব এখন নিজেদের ‘সাবালক’ দাবি করছেন। আসলে মহাসচিব যতই দাবি করুন, জাতীয় পার্টি এখনো সাবালক হতে পারেনি, কখনো হতে পারবে; তেমন সম্ভাবনাও নেই। একসময় বৃহত্তর রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় জাতীয় পার্টির নিজস্ব কিছু আসন ছিল। এখন তাও নেই। এককভাবে নির্বাচন করলে জাতীয় পার্টি বড়জোর গোটা পাঁচেক আসন পাবে। তাই মহাসচিব যতই নিজেদের ‘সাবালক’ দাবি করুন; বেশিরভাগ নেতাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করতে উতালা হয়ে গেছেন। তারা আসলে এমপি হওয়ার জন্য মরিয়া। আর আওয়ামী লীগের সহায়তা না পেলে অনেক বাঘা বাঘা নেতার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে, সেটা তারাও জানেন।

স্বৈরাচারী এরশাদের হাতে গড়া দল জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দুষ্টক্ষত। দলটির কোনো আদর্শিক চরিত্র নেই। পুরোটাই সুবিধাবাধিতায় ঠাসা। তবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে এই দলটির কিছু জনসমর্থন আছে। আর এই জনসমর্থন পুঁজি করেই দলটি আজ এ-ঘাটে, তো কাল ও-ঘাটে নৌকা ভেড়ায়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে পতনের পর কেউ ভাবেনি এরশাদ আবার এ দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’—এ আপ্তবাক্য পুঁজি করে জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের জায়েজ করে নিয়েছে। প্রথমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন এরশাদ। এরপর বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোট করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে জাতীয় পার্টি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সাফল্যে আওয়ামী লীগ বুঝে যায়, তারা একা বিএনপির সঙ্গে পারবে না। তাই জাতীয় পার্টিকে কাছে টেনে নেয় আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকেই জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক। ২০১৪ সাল থেকে গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি।

তবে জাতীয় পার্টিতে বরাবরই দুটি ধারা বিদ্যমান—একটি আওয়ামীপন্থি, অন্যটি আওয়ামীবিরোধী। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বরাবরই আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত। এরশাদ বেঁচে থাকতে বিভিন্ন সময়ে সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলেও নানা কারণে পারেননি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদ নির্বাচনে অংশ নিতেই চাননি। এমনকি জোর করলে তিনি আত্মহত্যারও হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু এরশাদকে অসুস্থ সাজিয়ে চিকিৎসার নামে সিএমএইচে আটকে রেখে আওয়ামী লীগ সেবার নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যায়। এরশাদ সিএমএইচ থেকে সরাসরি বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখান থেকে বের হন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে। এরশাদকে বশে রাখার কার্যকর একটি উপায় বের করে নিয়েছিল সরকারি দল। এরশাদ যখনই সত্যিকারের বিরোধী দল হওয়ার চেষ্টা করেছেন, তখনই মঞ্জুর হত্যা মামলার তারিখ পড়েছে। আর দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা এরশাদ আর কখনোই কারাগারে ফিরে যেতে চাননি। তাই নিজের পছন্দের রাজনীতিটাও করতে পারেননি শেষ জীবনে। বিএনপির সঙ্গে আদর্শিক নৈকট্য থাকলেও তার শেষ জীবনটা কাটাতে হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। আর ঘরের শত্রু বিভীষণ রওশন তো ছিলেনই। মামলার তারিখ পড়লেই এরশাদের বিপ্লব ফুরিয়ে যেত।

এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব পান তার ছোট ভাই জি এম কাদের। এরশাদের সঙ্গে রওশনের যে দ্বন্দ্ব ছিল, তার ধারাবাহিকতা এখন চলছে রওশনের সঙ্গে জি এম কাদেরের। দেবর-ভাবির দ্বন্দ্ব এখন বাংলাদেশের রাজনীতির রসালো আলোচনার বিষয়। তবে জি এম কাদের দলে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছেন। এবার অভিমান করে রওশন এরশাদ নির্বাচনী প্রক্রিয়াতে থাকেননি। তাই এবারের নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টিতে রওশন এরশাদের নেতৃত্বধীন ধারাটি বিলীন হয়ে যেতে পারে। সরকার এরশাদকে যে কৌশলে বশ করে রেখেছিল, জি এম কাদেরের জন্যও সেই একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। অবশ্য জি এম কাদের তো আর এরশাদের মতো দুর্বৃত্ত নন, যে কারণে তার বিরুদ্ধে পুরোনো কোনো মামলাও নেই। তাকে আটকাতে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত দুই নেতাকে দিয়ে মামলা করানো হয়েছিল। সেই মামলায় দীর্ঘদিন জি এম কাদেরের রাজনৈতিক তৎপরতায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে সব ঝামেলা সামলে উঠেছেন জি এম কাদের।

এরশাদের পতনের আগপর্যন্ত জাতীয় পার্টি একটাই ছিল। কিন্তু এরশাদ পতনের পর থেকে সুবিধাবাদীরা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় পার্টি কতবার কতভাবে ভেঙেছে তার হিসাব রাখা কোনো গবেষকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এখনো নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পাওয়া তিনটি জাতীয় পার্টি আছে। জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি-জাপা, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি-জেপি, নাজিউর রহমান মঞ্জুরের ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি। এ ছাড়া প্রয়াত কাজী জাফরের নামে একটি জাতীয় পার্টির আওয়াজ পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। এম এ মতিনের নামেও একটি জাতীয় পার্টির কথা শোনা যায়। এমন আরও অনেক জাতীয় পার্টি হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।

মাঠের বিবেচনায় তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কাগজে-কলমে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। আর মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। জাতীয় পার্টি যে সংসদে প্রধান বিরোধী দল, এটা মানুষ তো বিশ্বাস করেই না, আমার ধারণা জাতীয় পার্টি নিজেরাও নিজেদের বিরোধী দল বলতে লজ্জা পায়। এমন অদ্ভুত বিরোধী দল অবশ্য বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। সরকারি দলের নির্বাচনী মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টি নির্বাচনের পর প্রধান বিরোধী দল হয়ে যায়। তবে জাতীয় পার্টিকে সবাই আদর করে গৃহপালিত বিরোধী দল বলে। এবার তবু চক্ষুলজ্জার কারণে সরাসরি সরকারে যোগ দেয়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলও ছিল, আবার মন্ত্রিসভায়ও ছিল। একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে থাকার অতীত কোনো উদাহরণ না থাকলেও, গৃহপালিত বিরোধী দলের কীর্তিটি জাতীয় পার্টিরই গড়া। ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বাংলাদেশের মূলধারার সব রাজনৈতিক দল। তখন আ স ম আবদুর রব কাগুজে ৭২ দল নিয়ে একটি সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ) বানিয়ে এরশাদের সেই নির্বাচন বৈধতা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। সে নির্বাচনে আ স ম আবদুর রব ছিলেন গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা। এখন যেই দায়িত্ব পালন করছেন রওশন এরশাদ।

জি এম কাদের শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য থাকলেও এখন তিনি সরকারের সমালোচক। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করে আবার সরকারের সমালোচনা করলে জনগণ সেটা বিশ্বাস করে না। তাই জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব অনেক দিন ধরেই আলাদা নির্বাচন করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর কথা বলে আসছেন। জাতীয় পার্টির তৃণমূল নেতৃত্বও আলাদা নির্বাচনের পক্ষে। আসলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিএনপির অনুপস্থিতি জাতীয় পার্টির সামনে সুযোগ ছিল নিজেদের সত্যিকারের ‘সাবালক’ হিসেবে গড়ে তোলার, নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর। আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোট, তথা বিএনপির ভোটব্যাংকে যদি জাতীয় পার্টি ভাগ বসাতে পারত, তাহলে নিজেদের মতো বিকাশের সুযোগ ছিল তাদের সামনে। কিন্তু জাতীয় পার্টি সাধারণ ভোটারদের মনে তেমন কোনো ধারণা তৈরি করতে পারেনি। কেউই তাদের আওয়ামী লীগবিরোধী বা সত্যিকারের বিরোধী দল মনে করে না। তাই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টি সাবালক হতে পারছে না। বরং দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ছায়াতলে থাকায় জাতীয় পার্টির নিজস্বতা হারিয়ে গেছে। তাদের ভোটব্যাংকও এখন অনেকটাই আওয়ামী লীগের দখলে। আমরা যারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিলাম, জাতীয় পার্টির এ দুরবস্থায় উৎফুল্লই হই। তবে জাতীয় পার্টিকে টিকে থাকতে হলে, নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে, সত্যিকারের সাবালক হতে হবে।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হতে হবে : নীরব

ওরিকে স্বামী বললেন জাহ্নবী

ওজন কমানো নিয়ে প্রচলিত কিছু মেডিকেল মিথ

উত্তরাখণ্ডে বৃষ্টি ও ভূমিধসে ৬ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ১১

জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ ও কাদেরকে গ্রেপ্তার দাবি লায়ন ফারুকের

নাফ নদী বেপরোয়া আরাকান আর্মি, উপকূলজুড়ে আতঙ্ক

খোলা হয়েছে পাগলা মসজিদের দানবাক্স, মিলেছে ৩২ বস্তা টাকা

এক মঞ্চে কিম, পুতিন ও শি জিনপিং

ভিন্ন রূপে হানিয়া

রাজধানীতে আজ কোথায় কোন কর্মসূচি

১০

নাক ডাকা বন্ধ করার ৭ সহজ উপায়

১১

৩০ আগস্ট : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

১২

আট মাসে ইরানে ৮৪১ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

১৩

চার সেনাকে খুঁজে পাচ্ছে না ইসরায়েল

১৪

জ্ঞান ফিরেছে নুরের

১৫

বাংলাদেশের ম্যাচসহ টিভিতে আজকের খেলা

১৬

টাক মাথায় চুল গজাবে পেয়ারা পাতায়

১৭

জনগণের কল্যাণই তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য : মিল্টন ভুইয়া

১৮

আজ ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব জেলায়

১৯

রাজশাহীতে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে ভাঙচুর

২০
X