

বাংলাদেশের ফুটবলার ও ক্রিকেটারদের নিয়মিত বিজ্ঞাপন চিত্রে দেখা যাচ্ছে, তারা স্থান পাচ্ছেন বিভিন্ন বিলবোর্ডে। বিপরীতে নারী ক্রীড়াবিদদের বিপণন মাধ্যমে উপস্থিতি সেভাবে চোখে পড়ে না। নারী ফুটবল দল সাম্প্রতিক সময় একাধিক সাফল্য দিয়ে দেশবাসীকে গর্বিত করার পরও চিত্রটা বদলায়নি। এ বৈষম্য শুধু বিপণন মাধ্যমেই নয়, সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান।
২০২২ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ নারী দল মুকুট ধরে রেখেছে ২০২৪ সালে। ২০২৫ সালে এএফসি এশিয়ান নারী চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাই পরীক্ষায় পাস করে লাল-সবুজরা মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। সিনিয়র দলের পথে হেঁটে অনূর্ধ্ব-২০ দল সাফ মুকুট জয়ের পর এশিয়ার মঞ্চে পা রেখেছে। এতসব সাফল্যের পরও নিয়মিত ঘরোয়া কার্যক্রমের সুফল পাচ্ছে না নারী দল। সম্প্রতি ১১ ক্লাব নিয়ে শুরু হয়েছে নারী লিগ। দেশের নারী ফুটবলকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেওয়া নয়, এ লিগ আয়োজিত হচ্ছে নানা শর্ত পূরণ করতে। যে লিগ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলো। শর্ত পূরণের এ লিগের চিত্রটাও করুন। দলগুলোর মাঝে শক্তির তারতম্য পরিষ্কার—২৩-০ স্কোরলাইন যার প্রমাণ। অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলোর দেওয়া ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিয়েই খেলতে হচ্ছে নারী ফুটবলারদের। পারিশ্রমিকও যৎসামান্য!
সাফল্যের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও পুরুষ ফুটবলারদের আয় কিন্তু নারীদের থেকে কয়েক গুণ বেশি। ক্লাবগুলো থেকে তারা ভালো সুযোগ-সুবিধাও পান। এখনো নারীদের প্রধান আয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) থেকে প্রাপ্ত সম্মানী। নারী ফুটবলারদের তিন ক্যাটাগরির সম্মানীর প্রথম গ্রেডের জন্য বরাদ্দ ৫০ হাজার, পরের দুই গ্রেডে ৩০ ও ২০ হাজার টাকা করে। সব মিলিয়ে নারী ফুটবলকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে যেখানে সবকিছু ঢেলে সাজানোর কথা, তখন বরং উল্টো বৈষম্য স্পষ্ট হচ্ছে।
সে বৈষম্য কেবল পারিশ্রমিক, ঘরোয়া কার্যক্রমে সীমাদ্ধ নেই—বোনাস এবং উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও সেটা পরিষ্কার হচ্ছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ে পুরুষ ক্রিকেটাররা ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বোনাস পেয়েছেন। অন্যদিকে, নারী ফুটবল দল দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়ে পেয়েছে ১ কোটি টাকা। এটা ঠিক যে, ক্রিকেট বৈশ্বিক পরিসরে মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় করে। ক্রিকেটাররা বোর্ড থেকে বেতন ও ম্যাচ ফি পান, আয় করেন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে। আন্তর্জাতিক সাফল্য সীমিত থাকার পরও বিপুল আয়ের সুযোগ ক্রিকেটারদের সামনে। সরকারের তরফে নারী ও পুরুষদের আয়ের বৈষম্য দূর করতে নানা কথা বলা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।
নারী ফুটবলাররা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। নিয়মিত লিগ আয়োজিত হলে এবং আরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে নারী ফুটবলারদের পরিধি আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্য আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ফুটবলকে এখনো লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে! যারা সাফল্য এনে দেন, তাদের উৎসাহিত করার লক্ষণ খুব বেশি নেই। নারী দল সাফ জেতার পর সবাই বলেছে—‘বাংলাদেশ জিতেছে’। শেষ পর্যন্ত জয় পুরুষ বা নারীর নয়, জয় বাংলাদেশের। এখনই সময় নারী ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানোর। যাতে ভবিষ্যতে তারা গৌরব বয়ে আনার ন্যায্য পুরস্কারও পান।
মন্তব্য করুন