

ভারতীয় কোম্পানি আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। এজন্য সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সালিশি আদালতে গেলে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। এতে দেশে লোডশেডিং হবে। গতকাল রোববার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর অধীনে সম্পাদিত সব চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানায়।
কমিটির সদস্যরা জানান, আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি কীসের ভিত্তিতে করা হয়েছে, তার কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। এ চুক্তি সম্পাদনে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বছরে আদানিকে ৫শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি দিতে হচ্ছে। তারা আরও জানান, চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত-আটজনের অবৈধ সুবিধা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাংক হিসাব নম্বরে লেনদেনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের এ কমিটি গঠন করে। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান। এর আগে কমিটি গত ২০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে পর্যালোচনা কমিটির প্রধান হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। মামলার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই। আমরা চাইব পরবর্তী সরকার যেন এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদানির বিষয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা চলমান রয়েছে। হাইকোর্ট থেকে আমাদের কাছে আদানি নিয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল, সেটিও আমরা দিয়েছি। এখন আসলে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘কমিটি মনে করে, আদানির সঙ্গে চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ওই তথ্যের কথা আদানিকে জানিয়ে দিয়ে তাদের উত্তর চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। বিলম্ব করলে আমাদের মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যাবে। প্রাথমিকভাবে লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চুক্তির সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন সাত-আটজনের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ অনেক তথ্যপ্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। দুদক এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। তারা প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হিসাব নম্বরে লেনদেনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে বিদ্যুৎ কিনেছে, ওই সময়ে তার চেয়ে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সঙ্গে তুলনা করলেও এর দাম অনেক বেশি। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে, শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট। এতে বছরে ৪শ থেকে ৫শ মিলিয়ন ডলার বেশি বিল দিতে হচ্ছে আদানিকে। চুক্তি অব্যাহত থাকলে ২৫ বছর ধরে দিয়ে যেতে হবে।’
মামলার মতো পদক্ষেপে গেলে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে উল্লেখ করে মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘এতে দেশে লোডশেডিং হতে পারে। দেশের জনগণকে এজন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে আমি প্রয়োজনে লোডশেডিং মেনে নেব; কিন্তু এ দুর্নীতি মানব না।’
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের পরিশোধিত অর্থ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। বিপিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতায় উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সিস্টেমের ব্যবহার হার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ। কমিটি হিসাব করেছে, অতিরিক্ত বা অকার্যকর সক্ষমতার বার্ষিক আর্থিক ব্যয় প্রায় ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে দেউলিয়ার পথে রয়েছে বিপিডিবি।’
তিনি বলেন, ‘ঘাটতি ঠেকাতে গেলে পাইকারি দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর ৮৬ শতাংশ দাম বাড়ালে ভারত-চীন-ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। ওইসব দেশের শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশের শিল্প।’
এদিকে আদানি থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে তাদের সঙ্গে এখনো কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি এবং ওই প্রতিবেদন তাদের কাছে সরবরাহও করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদনটি সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কখনো বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ আদানির কাছ থেকে কোনো ধরনের মতামত বা তথ্য জানতে যোগাযোগ করেনি।
আদানি পাওয়ার বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা নিরবচ্ছিন্ন, উচ্চমানের এবং তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজার দামে (আমদানি করা সমজাতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে) বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছি। বিপুল অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রেখেছি, যখন অন্য অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে কিংবা বন্ধ করে দিয়েছে। বকেয়া অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে আমাদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে আদানির বকেয়া রয়েছে ৫শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মন্তব্য করুন