তিন বছর বয়সী রাহি আক্তার মা-বাবার সঙ্গে থাকে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারে। পরিবারের অন্য সদস্যরা হলেন তার ভাই রাফি, চাচা মানিক ও দাদি রিজিয়া বেগম। নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার চার দিন রাহিকে নিয়ে তার পরিবার রাত কাটিয়েছে স্থানীয় হজরত মৌলানা মোহাম্মদ আলী শাহের মাজার ও জামে মসজিদে। আর তাদের ছোট্ট জরাজীর্ণ সেমিপাকা ঘরটি ডুবে ছিল খালের ময়লা পানিতে।
শুধু রাহি কিংবা রাফি নয়। তাদের প্রতিবেশী ৬৫ বছরের খুরশিদা বেগমের পরিবারের সদস্যরাও ‘আধপেটে’ খেয়ে দিন কাটিয়েছেন স্থানীয় ওই মাজারে। ওই দুই পরিবারসহ মোট ১২ জন চার দিন কাটিয়েছেন মসজিদে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চকবাজারের আলী শাহ মাজার লেনসহ আশপাশে জলাবদ্ধতার চিত্র ছিল ভয়াবহ। জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে অনেকের বাসার ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি, বালিশ, তোশক ও আসবাব। পানি কমে গেলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। এখন তারা ভুগছেন নানা রোগব্যাধিতে। এতে টানাটানির সংসারে যোগ হয়েছে নতুন খরচা।
রাহির চাচা মানিক বলেন, ‘আমাদের ঘরটি চাক্তাই খালের সঙ্গে লাগোয়া। গত বৃহস্পতিবার যখন পানি ঢুকতে শুরু করে, আমরা আলী শাহ মাজারে চলে যাই। সেখানেও নিচতলা ডুবে ছিল। আমরা দোতলায় ছিলাম। চার দিনে এক প্যাকেট বিরিয়ানি ও ভাত দেওয়া হয়েছিল, যেটা একজনেও খেতে পারিনি। বাকি সময় কিনে খেয়েছি।’
এ পরিবারটি কিনে খেতে পারলেও বৃদ্ধা খুরশিদা বেগমের কপালে তাও জোটেনি। তিনি বলেন, ‘মাজারে তিন দিন ছিলাম। এ সময় কেউ খোঁজ নেইনি। কখনো চা-বিস্কুট খেয়ে ছিলাম। পানি একটু কমলে দুই দিন পর কালামিয়া বাজার এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাই। ঘরে এখনো পানি।
গতকাল শনিবার সরেজমিন চকবাজার আলী শাহ লেনে দেখা যায়, রাহিদের ঘর থেকে পানি নেমে গেলেও রয়ে গেছে খুরশিদা বেগমের ঘরে। শনিবার দুপুরে ঝাড়ু ও বেলচা দিয়ে ঘর পরিষ্কার করছিলেন সেলিনা আক্তার। কাপড়ে বাঁধা শপিং ব্যাগের প্যাকেট দেখিয়ে তিনি বলেন, ফ্রিজসহ সব নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি বালিশ নেই। শপিং ব্যাগে কাপড় ঢুকিয়ে সেটা মাথায় দিয়ে ঘুমাচ্ছি।
দুই খালের মধ্যে ভুগছে ৯০০ পরিবার : এলাকার বাসিন্দারা জানান, তাদের দুই পাশে হিজড়া ও চাক্তাই খাল। বৃষ্টি শুরু হলে ওই দুই খালের পানি ঢুকে পড়ে এলাকায়। ভেসে যায় এলাকার দোকানপাট, ঘরবাড়ি, কাঁচাবাজারসহ বড় একটি অংশ। এলাকাটিতে প্রায় ৯০০ পরিবারের বসবাস।
চকবাজারের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে জলাবদ্ধতার কষ্টে ভুগছি। জলাবদ্ধতা কমাতে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুই কাজে আসেনি। দুই খাল থেকে পানি ঢুকে পড়ে এলাকায়। তাই চাপ কমাতে চকবাজার কাঁচাবাজারের মাঝখানে একটি বড় আন্ডার ড্রেন করা হয়েছে। কিন্তু সেটা দীর্ঘ বছর ধরে পরিষ্কার করতে দেখিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আন্ডার ড্রেনের ওপরে স্লাব বসিয়ে যানবাহন ও মানুষ চলাচল করে। কিন্তু অনেক টাকা খরচায় ড্রেনটি করার পর থেকে আর পরিষ্কার করা হয়নি। তাই পানি নামতে না পেরে লোকালয়ে প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে হিজড়া খাল সংলগ্ন দেয়ালটি কিছুদিন আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাই টানা বৃষ্টি হলেই সেই জায়গা দিয়ে সরাসরি পানি ঢুকে পড়ে। এতে হাজারো বাসিন্দা পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ : জলাবদ্ধতা ঘোচাতে সম্প্রতি ওই এলাকায় সড়ক ও ড্রেন নতুন করে উঁচু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেখানে চার ফুট পানি ওঠে সেখানে দুই থেকে আড়াই ফুট উঁচু করে দায়সারা কাজ করছে সংস্থাটি। তা ছাড়া এলাকার নালা ও ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না বছরের পর বছর। চকাবাজারের কাঁচাবাজার সংলগ্ন ড্রেনটি স্লাব তুলে পরিষ্কারের দাবি জানিয়েছে বাসিন্দারা।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ও মেয়রের একান্ত সচিব মুহাম্মদ আবুল হাশেম কালবেলাকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতার পর এলাকাটিতে গিয়েছি। ওই ড্রেনটি পরিষ্কার আছে। পেছনে চাক্তাই খালে ময়লা থাকার কারণে সেখানে পানি নামতে পারিনি। খালটি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধীনে হলেও আমরা পরিষ্কার করে দিয়েছি।’
স্থানীয় কাউন্সিলর নুরুল মোস্তফা টিনু বলেন, আমার ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজারের বেশি পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এখনো যারা ত্রাণ পায়নি তাদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন