কোম্পানির শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলেও কালাম মূলত একজন প্রতারক। একই কোম্পানির সব শেয়ার বিক্রির চুক্তি করে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এখন শেয়ার হস্তান্তরের নামে করছেন টালবাহানা। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও একই কায়দায় প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন অনেককে। এ-সংক্রান্ত বেশকিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। কালামের প্রতারণার সর্বশেষ শিকার ‘ওলিলা গ্রুপ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান।
জানা গেছে, বিয়ানীবাজার পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার বিক্রির কথা বলে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান কালাম ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন ওলিলার জিল্লুর সাহেবের কাছ থেকে। কিন্তু এখনো শেয়ার বুঝিয়ে দেননি। উল্টো টাকা আদায়ের কথা বলে গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর নিকেতনে ওলিলা গ্রুপের অফিসে অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী নিয়ে হানা দেন কালাম। ওলিলা গ্রুপের পক্ষ থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে সহায়তা চাওয়া হলে পুলিশ সেখানে গিয়ে কালাম ও তার সঙ্গীদের ওই অফিস থেকে বের করে দেয়।
এ ব্যাপারে ওলিলা গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মেজর (অব.) এ কে এম রফিকুল হক জানান, গত ১৪ জানুয়ারি আবুল কালাম অর্ধশতাধিক ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে আমাদের অফিসে জোর করে প্রবেশ করে। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা ছাড়াও তারা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা দেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে। পরে পুলিশ এসে তাদের বের করে দেয়।
এদিকে, ওলিলা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের দাবি, তার কাছে কালাম কোনো টাকা পান না। উল্টো শেয়ার কিনে নিজেই প্রতারিত হয়েছেন বলে দাবি জিল্লুরের। কালবেলাকে এই ব্যবসায়ী বলেন, বিয়ানীবাজার পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির শেয়ার কেনার জন্য ২০১৭ সালে কালামের সঙ্গে আমার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু শেয়ার হস্তান্তর না করে কালাম আমেরিকা চলে যান। এতে আমি ব্যবসায়িকভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। কালাম ২০২২ সালে দেশে ফিরে আরও একটি চুক্তি করে। যেখানে আমার ক্ষতিপূরণসহ আমার শেয়ার বুঝিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করে। এই দুই দফা চুক্তি ও টাকা নিলেও আমাকে কালাম তার শেয়ার হস্তান্তর করেনি। উল্টো আমার কাছে টাকা পাবে বলে অফিসে সন্ত্রাসীদের নিয়ে হানা দেয়।
কালবেলার হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫ সালে একই কায়দায় বাংলাদেশ ইরেকটরস লিমিটেডের কাছে বিয়ানীবাজার পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার বিক্রি করেন কালাম। তবে ২০১৭ সালে জিল্লুরের কাছে শেয়ার বিক্রির সময় সেই তথ্য গোপন করেন। যদিও ইরেকটরসের কাছ থেকে টাকা নিয়েও তাদের শেয়ার দেননি কালাম। এ ঘটনায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কালাম ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে আদালতে নালিশি মামলা করে ইরেকটরস। মামলাটি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
২০২৩ সালে কালাম ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআই অর্গানাইজড ক্রাইমের (দক্ষিণ) উপপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। তিনি প্রতিবেদনে বলেন, কোম্পানির শেয়ার বিক্রির নামে আবুল কালাম ও তার সঙ্গীরা ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে টাকা আটকে রাখলেও শেয়ার হস্তান্তর করেনি। টাকা ফেরত দেবে দেবে বলেও দেয়নি। কালাম ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে বিশ্বাস ভঙ্গ করে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪০৬/৪২০ ধারায় অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রতীয়মান হয়েছে।
শুধু দেশে নয়, বিদেশেও নামে-বেনামে কোম্পানি খুলে প্রতারণা করার অভিযোগ রয়েছে কালামের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, আমেরিকায় ৫টি কোম্পানি রয়েছে তার। সেগুলোর মাধ্যমে প্রতারণার কারণে আমেরিকায় জেলও খাটতে হয়েছে তাকে। প্রতারণা ও সন্ত্রাসীদের নিয়ে ওলিলা গ্রুপের অফিসে হানা দেওয়ার বিষয়ে জানতে আবুল কালামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে কল করেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।