যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার যুক্তরাজ্য ফেরত পাঠাচ্ছে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের। এরই মধ্যে দেশটি ১৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠাচ্ছে বলে কালবেলাকে নিশ্চিত করেছে ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট মিশন সূত্র। তারা জানাচ্ছে, যেসব বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে এই বাংলাদেশি অভিবাসীদের বহনকারী বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইট এইচএফএম৮৫১-এর লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে ইসলামাবাদ হয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বাংলাদেশ মিশন লন্ডনের একটি সূত্র কালবেলাকে জানায়, বাংলাদেশ হাইকমিশন, লন্ডনের কনস্যুলার শাখা এসব অবৈধ অভিবাসীর দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্দেশ্যে ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করেছিল। যারা দেশে ফিরে আসছেন তাদের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ বৈধ পাসপোর্টধারী, কেউ মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টধারী। বাংলাদেশ মিশন লন্ডনের পক্ষ থেকে গত ২৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক অতীব জরুরি চিঠিতে জানানো হয়, যুক্তরাজ্য থেকে যে ১৫ জন ফেরত আসছেন তাদের মধ্যে ৬ জনের পাসপোর্ট (বৈধ ই-পাসপোর্ট এবং মেয়াদোত্তীর্ণ এমআরপি) থাকায় তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ওই ৬ জনের মধ্যে ৩ জনের বৈধ পাসপোর্ট থাকায় তাদের বাংলাদেশে ফেরত আসতে ট্রাভেল পারমিটের প্রয়োজন নেই এবং বাকি ৩ জনের বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় তাদের অনুকূলে স্বাক্ষরিত এসওপি অনুযায়ী ট্রাভেল পারমিট প্রদান করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৯ জনের পাসপোর্ট না থাকায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তার মাধ্যমে ইন্টারভিউ গ্রহণ করে তাদের জাতীয়তা/পরিচয় নিশ্চিত করা হয় এবং ট্রাভেল পারমিট প্রদান করা হয়েছে। চিঠিতে আরও জানানো হয়, বিশেষ ফ্লাইটটি ২৮ আগস্ট লন্ডনের স্থানীয় সময় রাত ৯টায় স্টানস্টেড থেকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হবে এবং পরে ইসলামাবাদ থেকে ২৯ আগস্ট দুপুরে ঢাকায় পৌঁছবে।
আরেকটা নির্ভরযোগ্য সূত্র কালবেলাকে জানায়, গত ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার অনু বিভাগের পক্ষ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে দেশের সুরক্ষা সেবা বিভাগ এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, যুক্তরাজ্য থেকে অবৈধ অভিবাসীরা ফেরত আসছেন এবং এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে ১৫ জন অবৈধ বাংলাদেশিকে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য যুক্তরাজ্যের হোম অফিস উদ্যোগ নেয়। পরে যুক্তরাজ্য হোম অফিস লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে উল্লিখিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের অনুকূলে ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর জন্য আবেদন করে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ হাইকমিশন ট্রাভেল পারমিট প্রদান করে।
ফেরত আসার তালিকার মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, লাকসাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ঢাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে নারীও রয়েছেন। তাদের জন্য ইস্যু করা ট্রাভেল পারমিটগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় এদের মধ্যে ৬ জনের কোনো পেশা উল্লেখ নেই অর্থাৎ দেশটিতে তারা নির্দিষ্ট কোনো কাজে নিয়োজিত নেই। এ ছাড়া কয়েকজন সে দেশে ওয়েটারসহ নানা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এ তালিকায় শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানান, ‘অনেকেই দেশটিতে ভিসার মেয়াদ শেষেও অবস্থান করে, এদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান। যারা ফেরত আসছেন, তাদের মধ্যে অনেকের বৈধ পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও তারা মেয়াদহীন ভিসা নিয়ে দেশটিতে অবস্থান করছিলেন।’
বর্তমান অভিবাসন বাস্তবতায় নাজুক বাংলাদেশের অবস্থান: বিশ্বজুড়ে অভিবাসন নীতির কঠোরতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অভিবাসীদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তাদের মতে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে আরও বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধান করা উচিত বলেও তারা মনে করেন।
জানতে চাইলে সরকারের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানান, ‘বাংলাদেশিদের অনেকেই ভুল তথ্য দেওয়ায় অভিবাসন নীতি তাদের কাছে কঠোর হয়ে যায়। অনেকেই অবৈধ উপায়ে বিদেশ যান কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিদেশের মাটিতে অবৈধ উপায়ে পা দিলে ফেরত আসার সম্ভাবনা থাকবেই। এসব জেনেও অনেকেই যান। এটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, তবে ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতা দরকার।’
বিশ্বে বর্তমান অভিবাসন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রাপ্তি কমছে কেন জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিবাসন পরিস্থিতি নাজুক দেশের অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্যই। তারা সঠিক কাগজপত্র ছাড়া মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে ভিসা আবেদন করে। এ ছাড়া বিদেশের মাটিতে কেউ কেউ উচ্ছৃঙ্খল ও অন্যায় কাজও করে, যা দেশের অভিবাসন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
মন্তব্য করুন