বশির হোসেন, খুলনা
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪০ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
খুলনা

তিনটিতে বিএনপি, দুটিতে জামায়াত এগিয়ে

তিনটিতে বিএনপি, দুটিতে জামায়াত এগিয়ে

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটিতে বিএনপি, দুটি জামায়াত জোটের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি একটি আসনে ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে বলে মনে করেন তারা। একটি আসন জোটের প্রার্থীকে ছাড় দেওয়ায় বাকি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জামায়াতে ইসলামী। নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রগঠনে জনগণ পরিবর্তন চাইছে, তাই জয়ের জন্য আশাবাদী তারা। তবে বিএনপি আমলের উন্নয়ন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বের কারণে জেলার সব আসনই নিজেদের দখলে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস বিএনপির। ইসলামী আন্দোলনের পাঁচ প্রার্থীসহ জেলার ছয়টি আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী ৩৮ জন।

খুলনা-১: সুন্দরবনবেষ্টিত দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরাবরই বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিখ্য থাকায় অনেকে এটিকে আওয়ামী লীগের কেনা আসন হিসাবে চেনেন। সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বাকি ৫টি আসন জিতলেও এই এক আসন ছিলটি আওয়ামী লীগের দখলে। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এই আসন ঘিরে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে।

আসনটিতে জামায়াতসহ মোট ছয়টি রাজনৈতিক দল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এখানে বিএনপির দুই নেতা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত জমা দিয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান। জামায়াত প্রথা ভেঙে ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করেছে।

৩ লাখ ৩ হাজার ৫৪২ জন ভোটারের এ আসনে এবার পুরুষের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি। ১৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ধানেরশীষ প্রতীকে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের কৃষ্ণনন্দী এবং চালনা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী অচিন্ত্য মন্ডলের নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। তাই আসনটির সাধারণ ভোটারদের মুখেও এই তিন প্রার্থীকে ঘিরে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

খুলনা-২: সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে বিবেচিত। ২০০৮ সালে সারাদেশে বিএনপির ভরাডুবি হলেও এই আসনটি ছিল দলটির দখলে। এর আগে ২০০১ সালে এই আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও। খুলনা সিটি করপোরেশনের ১৬ থেকে ৩১ নং ওয়ার্ড নিয়ে খুলনা-২ আসন। এই আসনের মধ্যে খুলনা শহরের মুল অংশ। ফলে আসনটিকে বিভাগের প্রধান আসন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন বিএনপির সব ধরনের দলীয় পদ পদবীর বাইরে থাকলেও ধানের শীষের কান্ডারি হন সাবেক সংসদ সদস্য ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। নেতাকর্মীরা তিন ভাগে বিভক্ত থাকায় মনোনয়ন পাওয়ার দেড় মাসের মাথায়ও সবাইকে এক করে মাঠে নামাতে পারেননি তিনি। তবে কেন্দ্রের নির্দেশনায় সম্প্রতি তিন গ্রুপের নেতাদের নিয়ে নির্বাচনী পরিচালনা কমিটি করা হলেও নির্বাচনে মঞ্জুর ভরসা বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের পদবঞ্চিত তার অনুসারীরা। আসনটিতে মঞ্জুর প্রতিপক্ষ নগর জামায়াতের সেক্রেটারি ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন এবং এনসিপির প্রার্থী রয়েছে আসনটিতে। তবে বিএনপির ঘাটি হিসাবে বিবেচিত এই আসনে হেবিওয়েট প্রার্থী হিসাবে নজরুল ইসলাম মঞ্জু জয়ের দেখা পেতে পারেন বলে স্থানীয় ভোটাররা মনে করেন।

নজরুল ইসলাম মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতৃত্বের মধ্যে একটি দূরত্ব ছিল। সেই দূরত্ব কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লেগেছে। এখন খুলনায় ঐক্যবদ্ধ বিএনপি ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। আর খুলনার মানুষ তাদের পুরোনো দিনের সাথী মঞ্জু এবং তাদের পছন্দেও মার্কা ধানের শীষে ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে।’

খুলনা-৩: এক সময় আসনটি সারা দেশের মধ্যে শিল্পে ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মডেল ছিল। কালের বিবর্তনে মিল-কলকারখানা বন্ধ হয়ে আসনটি এখন বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত। খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানার একটি অংশ নিয়ে খুলনা-৩ আসন। কেন্দ্রীয় নেতা রকিবুল ইসলাম বকুলকে খুলনা বিএনপির অভিভাবক হিসাবে মানেন এখানকার নেতাকর্মীরা। তাই তার আসনেই নগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সবাই সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলো বর্তমানের সব কমিটিই বকুলের হাতে তৈরি। ফলে ধানের শীষের প্রার্থী বকুলের নির্বাচনী প্রচারে নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

এদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এই আসনে নির্বাচন করছেন জামায়াতের খুলনা মহানগর আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। এক সময় দৌলতপুর এলাকায় থাকার সুবাদে এবং ছাত্রশিবির খুলনা মহানগর সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় দৌলতপুর এলাকায় মাহফুজুর রহমানের ভোট ব্যাংক আছে। ফলে দুজনের লড়াই হলেও বকুলকেই এগিয়ে রাখছেন অনেকে।

খুলনা-৪: ভৈরব ও রূপসা নদের পূর্বপারের তিনটি দ্বিপ উপজেলা--রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া নিয়ে খুলনা-৪ আসন। এই আসনটিতে এক সময় চরমপন্থি ও সর্বহারাদের আনাগোনা ছিল। আওয়ামী লীগের দখলেই বেশিরভাগ সময় থাকা এই আসনের এমপি ছিলেন সাবেক হুইপ মোস্তফা রশীদী সুজা এবং সর্বশেষ এমপি ছিলেন খেলোয়ার থেকে ব্যবসায়ী পরে এমপি বনে যাওয়া সালাম মুর্শেদী। তবে দীর্ঘ বছরের পর এবার আসনটি নিজেদের দখলে নিতে চায় বিএনপি। প্রার্থীও হেবিওয়েট হিসাবে বিবেচিত দলের কেন্দ্রীয় ও জনপ্রিয় মুখ আজিজুল বারি হেলাল। আসনটিতে বিএনপির তিনজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা থাকায় প্রাথমিকভাবে চ্যালেঞ্জ মনে হলেও এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন হেলালের সঙ্গে। ফলে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আজিজুল বারী হেলাল। আসনটিতে দাড়িপাল্লার কেউ নির্বাচন করছেন না। খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন জামায়াত জোটের প্রার্থী। ফলে আসনটি অনেকটাই বিএনপির দখলে চলে যাবে বলে বলছেন সাধারণ ভোটার ও বিশ্লেষকরা।

খুলনা-৫: ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনে এবার দুই হেভিওয়ের প্রার্থী মুখোমুখি। জামায়াতে ইসালামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বিসিবির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. আলী আগসর লবির মধ্যে হবে মূল লড়াই।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্য থাকায় প্রথম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে একক আধিপত্য ধরে রাখে আওয়ামী লীগ। ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া বাকিগুলোতে জয় পেয়েছে দলটি। তবে আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিন্ন চিত্র আসনটিতে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা এবার লড়াইয়ে পরস্পর মুখোমুখি হওয়ায় দেখা দিয়েছে নানা সমীকরণ। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে জয় পান জামায়াত ইসলামী নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার। এবার দুই হেভিওয়েটের মধ্যে লড়াই হবে সমানে সমান-- এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। তবে শেষ হাসি কে হাসবেন, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফ্রেব্রয়ারি।

এদিকে খুলনার একমাত্র নারী প্রার্থী জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন ইয়াসমীনও এই আসনের প্রার্থী। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) চিত্তরঞ্জন গোলদার।

খুলনা-৬: সুন্দরবন বেষ্টিত দুর্গম উপকুল এলাকা কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসন বরাবরই আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের দখলে ছিল। এবারও জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। ২০১৮ সালে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। ৪ লাখ ১৮ হাজারের বেশি ভোটার এর এই আসনে পাইকগাছা উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি আর কয়রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইতোমধ্যেই কয়রা ও পাইকগাছার বিভিন্ন ইউনিয়নে কর্মী সভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পীর মনোনয়ন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। তবে অতীত ইতিহাস ও কার্যক্রম বিবেচনায় এবার এই আসনটিতে জামায়াতকে অনেকে এগিয়ে রাখলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে : দুলু

জবির প্রশাসনিক ভবনে তালা, টানা ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ উপাচার্য-কোষাধ্যক্ষ

মার্কিন হামলার আশঙ্কায় বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন খামেনি

সরকারের বিজ্ঞপ্তি / নির্বাচনের দিন ও আগে যে কোনো সহিংসতায় আ.লীগকে দায়ী করা হবে

বাংলাদেশকে নিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ মন্তব্য করলেন মদন লাল

জামায়াতের নায়েবে আমিরের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাল ইসলামী আন্দোলন

ভারতের সাবেক হাই কমিশনারের বক্তব্যের কড়া জবাব দিল জামায়াত

সভাপতির অসহযোগিতায় নিয়োগ স্থগিত : শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সক্ষমতা যাচাইয়ের আহ্বান টিআইবির

অতীতে বিএনপি-জামায়াত সরকারে মানুষের চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয় নাই : চরমোনাই পীর

১০

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো সাংবাদিক মার্ক টালি মারা গেছেন

১১

সন্ধ্যা নদীতে নিখোঁজ কিশোর, ২৪ ঘণ্টা পর মিলল মরদেহ

১২

জনগণের ভোটই ক্ষমতার উৎস :  মির্জা আব্বাস

১৩

দল ঘোষণার পরও বিশ্বকাপ বয়কটের নতুন বার্তা, খেলা জমিয়ে দিল পাকিস্তান

১৪

সৌদি আরবে ১৮ হাজার প্রবাসী গ্রেপ্তার

১৫

ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি ছুড়ে টাকার ব্যাগ ছিনতাই

১৬

ফেনীতে মেডিকেল কলেজ ও ইপিজেড স্থাপন করা হবে : তারেক রহমান

১৭

শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া কোনো জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না : শিক্ষা উপদেষ্টা

১৮

রমজানের পণ্য নিয়ে ‘সুখবর’ দিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা

১৯

যেসব খাবার আপনার দাঁতের ক্ষতি করছে নীরবে

২০
X