

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে মার্কিন নৌবহর ইরানের জলসীমার একদম কাছে অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে ইরানও সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন শুধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্দেশের অপেক্ষা—আর তাতেই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হতে পারে ভয়াবহ যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সামরিক হামলার সম্ভাব্য বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা, সামরিক ঘাঁটিতে অভিযান এবং সেনা কমান্ডারদের লক্ষ্য করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ‘মানবাধিকার রক্ষার’ যুক্তি দেখিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক বক্তব্যে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেই সামরিক বাহিনী তা বাস্তবায়নে প্রস্তুত। তার দাবি, ইরান পরমাণু বোমা অর্জনের পথে এগোচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি।
তবে ইরান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্য, পরমাণু কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিটি দেশেরই এটি চালানোর অধিকার আছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উপদেষ্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, হামলা হলে ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, ইসরায়েলকেও জবাব দেবে।
ইরানের সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে বড় ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনী ঘোষণা করে, তারা ১ হাজার নতুন ড্রোন যুক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে আত্মঘাতী, নজরদারি ও সাইবার সক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন। সেনাপ্রধান আমির হামাতি বলেন, ‘বিদ্যমান হুমকির ভিত্তিতে আমাদের যুদ্ধ সক্ষমতা কৌশলগতভাবে বাড়ানো হয়েছে।’
গত জুনে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। ইরানের সেনা মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ আকরামিনিয়া বলেন, সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে আংশিক জবাব দেওয়া হয়েছিল, তবে এবার হামলা হলে ‘তাৎক্ষণিক ও পূর্ণাঙ্গ জবাব’ দেবে তেহরান।
এদিকে, তেহরানের সাধারণ মানুষ দ্বিধান্বিত অবস্থানে রয়েছে। কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছুই করতে পারবে না, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘দ্বিতীয়বারের মতো বড় সংঘাত শুরু হলে তার মাশুল গুনতে হবে আমাদেরই।’
ইরান সরকারও বেসামরিক প্রস্তুতির উদ্যোগ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষমতা দিয়েছেন গভর্নরদের। তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি জানিয়েছেন, ভূগর্ভস্থ পার্কিং শেল্টার নির্মাণ পরিকল্পনায় রয়েছে, তবে তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
তবে এই উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কাতারের আমির ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ফোনে আলোচনা করেছেন। তুরস্ক সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, যেখানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও দুপক্ষকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরানে হামলার প্রয়োজন হয়তো পড়বে না।’ যদিও এক দিন আগেই তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ‘তেহরানের সময় ফুরিয়ে আসছে।’ তার এই দ্বৈত বার্তার মধ্যে পরিষ্কার যে, চাপের কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক হুমকিকেও কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় এসে ঠেকেছে, যেখানে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও গড়াতে পারে বড় সংঘাতে। আর সেই সংঘাত যদি শুরু হয়, তার প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রে নয়—বিপর্যস্ত করবে পুরো বিশ্বকে।
মন্তব্য করুন