আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) অংশগ্রহণ করা-না করা নিয়ে নাটকীয়তা এখনো চলছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার না হওয়া সত্ত্বেও গতকাল সোমবার থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে দলটি। প্রথম দিনে উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন দলের সব পর্যায়ের নেতারা। এদিকে জাপার উভয়পক্ষের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে বিরোধী দলের চলমান নাটক সমাধানের চাবি। যে কোনো সময় গণভবনে ডাক পড়তে পারে দলটির শীর্ষ নেতাদের। এ বৈঠকের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দূতিয়ালি করছেন রওশন এরশাদ। তার সঙ্গে যেতে চায় জি এম কাদের পক্ষও। বৈঠক শেষে জাপার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে।
দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে গতকাল আনুষ্ঠানিক ফরম বিতরণ কার্যক্রম শুরু হলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। জানা গেছে, তার পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন জাপার যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম। আর এরশাদপুত্র সাদের আসনে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। দলটি মনোনয়ন ফরম বিক্রির সময় এক দিন বাড়িয়ে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত করেছে। প্রথম দিন বিক্রি হয়েছে ৫৫৭টি ফরম।
মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না, সে বিষয়ে দলটি এখনো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখছি। সময়ের বাধ্যবাধকতা আছে, তাই নির্বাচনী কার্যক্রম এগিয়ে রাখছি। দলের চেয়ারম্যান ৩০ নভেম্বরের আগে নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০০৮ সালে শুধু আমরা মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিই। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের আসনভিত্তিক নির্বাচনী সমঝোতা ছিল। বর্তমানে জাপা কোনো জোটের সঙ্গে নেই। আমরা তিনশ আসনেই নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
তবে দলের কো-চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, মানুষের ও দেশের স্বার্থে আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি। উন্নয়নমূলক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। দেশের অগ্রগতি ও স্বার্থ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বিদেশিরা এসে কেন প্রেসক্রিপশন দেবেন? আমরা বিশ্বাস করি, আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, জাপা নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের জন্য আমি পুরোপুরি প্রস্তুত। দল যে নির্দেশনা দেবে, তা মেনে কাজ করব। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে হবে বলে আমি মনে করি।
জাপার একাধিক সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে দলটি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন বণ্টন এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় বেঁকে বসেছেন জি এম কাদের। এ ছাড়া জাপার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো, বিএনপির নির্বাচনী অবস্থান। বিএনপি নির্বাচনে এলে আবারও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করবে জাপা। না এলে ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দেবে দলটি। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কিছু আসনে সমঝোতা হবে। বাকি আসনগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হতে পারে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখাতে সেসব আসনে সব দলের প্রার্থীদের অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
গতকাল জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের নিজের আসন লালমনিরহাট সদর আসনের পরিবর্তে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন সাদ এরশাদের আসন রংপুর সদর থেকে। তার স্ত্রী শেরিফা কাদের ঢাকা-১৮ আসনের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। এ ছাড়া দলটির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।
এর বাইরে উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসরিন জাহান রত্না এমপি, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি, রানা মোহাম্মদ সোহেল (অব.) এমপি, আতিকুর রহমান আতিক, নুরুল ইসলাম তালুকদার এমপি, ভাইস চেয়ারম্যান আহসান আদেলুর রহমান এমপি মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ সদর থেকে রওশন এরশাদের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গার রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও রংপুর সিটির একাংশ) আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও রংপুর জেলা জাপার সদস্য আল মামুন। সকাল ১১টার দিকে বাবলার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৪ আসন থেকে সহস্রাধিক নেতাকর্মীসহ বর্ণাঢ্য মিছিল নিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে বনানীর জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে আসেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত বাবলার সমর্থকরা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখে পুরো এলাকা। বাবলার পক্ষে মনোনয়ন ফরম কেনেন তার স্ত্রী ও জাপার ভাইস চেয়ারম্যান সালমা হোসেন।
এবার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের জন্য বিভাগ অনুযায়ী আটটি বুথ করা হয়েছে। প্রতিটি মনোনয়ন ফরমের মূল্য ৩০ হাজার টাকা। ২৪ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন দুটি বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। ২৪ নভেম্বর রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ, ২৫ নভেম্বর খুলনা ও বরিশাল বিভাগ, ২৬ নভেম্বর ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।