জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আবহাওয়ার রুদ্রমূর্তি ধারণ স্পষ্ট হচ্ছে। দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে গ্রীষ্মকাল। বর্ষা মৌসুমে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বর্ষা আসছে দেরিতে, যাচ্ছেও দেরিতে। তাপপ্রবাহের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মেঘাচ্ছন্ন দিনের পরিমাণ বাড়ছে। শীতের সময় দিনের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ধানের ফলনেও প্রভাব পড়ছে। আর বর্ষার সময় পরিবর্তন হওয়ায় সামগ্রিক কৃষি খাতেই প্রভাব পড়ছে; ডেঙ্গুর মতো কীটপতঙ্গ বাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বছরজুড়ে বায়ুদূষণের কারণেও তাপমাত্রায় প্রভাব পড়ছে।
‘বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু: আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের প্রবণতা এবং পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণায় গত ৪৩ বছরে আবহাওয়ার নানা পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিজয় সরণির বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর মিলনায়তনে আবহাওয়া অধিদপ্তরের উদ্যোগে গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও নরওয়ের আরও পাঁচজন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
সারা দেশের ৩৫টি আবহাওয়া স্টেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এ গবেষণা করা হয়েছে। বছরের চারটি সময় ধরে এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো—শীতকাল (ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি), প্রাক-বর্ষা (মার্চ, এপ্রিল ও মে) বর্ষা (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) এবং বর্ষা-পরবর্তী (অক্টোবর ও নভেম্বর)।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, ‘গরমে দেশের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। গরমের সময় বাড়ছে। অন্যদিকে, শীতের সময় কমেছে। শীতে দিনের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। এতে করে মেঘ ও কুয়াশার পরিমাণও বাড়ছে। ২০১০ সালের পর ঢাকা বিভাগে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। এর একটা বড় কারণ দূষণ। ভবিষ্যতে এই তাপমাত্রা বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘বর্ষার সময় তাপমাত্রা বাড়ছে সারা দেশে। এখন অক্টোবর ও নভেম্বর মাসেও ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ, বর্ষার সময় পরিবর্তন হয়েছে, বৃষ্টি দেরি করে আসছে এবং দেরি করে যাচ্ছে। প্রি মনসুন, মনসুন ও পোস্ট মনসুনের যে বিষয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে পোস্ট মনসুনে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে।’
বজলুর রশীদ বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে দেশের তাপমাত্রায় বড় প্রভাব পড়ছে। আর এ ক্ষেত্রে ট্রান্সবাউন্ডারি বায়ুদূষণের প্রভাব রয়েছে। শীতের সময় গড় তাপমাত্রা বাড়লেও দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য অনেকটাই কমে গেছে। এর কারণ বায়ুদূষণ।’
তিনি জানান, ঢাকার তাপমাত্রা ৪০ বছর ধরেই বাড়ছে। আবার ঢাকাসহ দেশের আট বিভাগেই বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার সীমা বেড়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রাজশাহীতে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে তাপপ্রবাহ শুরু হতো মার্চের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহ থেকে। তবে ১৯৯৭ সালের পর থেকে এতে ভিন্নতা দেখা গেছে। এখন দেখা গেছে, এটিও পিছিয়ে যাচ্ছে। এপ্রিল ও মে মাসজুড়েই তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। এমনকি ২০১০ সালের পর থেকে বর্ষা মৌসুমেও তাপপ্রবাহ বেড়েছে। উত্তর-পশ্চিমের জনপদ রাজশাহীতে দেখা গেছে, ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে বর্ষা মৌসুমে দুই থেকে তিনটি করে তাপপ্রবাহ বয়ে যেত। সেটি ২০১০ থেকে ২০২০ সালের দিকে ৮ থেকে ১২টি পর্যন্ত হয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রংপুর, খুলনাসহ প্রায় সব বিভাগে বর্ষা মৌসুমেও তাপপ্রবাহের সংখ্যা বেড়েছে। তবে চট্টগ্রামে তাপপ্রবাহের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম।
সাধারণত মে মাসের শেষের দিক থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বাংলাদেশের মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। আর তা চলে যেতে থাকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। গবেষণার তথ্য বলছে, ২০০০ সালের পর থেকে কখনো কখনো বর্ষা আসতে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হয়ে যাচ্ছে। গত বছর বর্ষা এসেছে ৮ জুন। একইভাবে বর্ষা যাচ্ছেও দেরি করে। গত ১০ বছরে কখনো কখনো ২৩ অক্টোবর পর্যন্তও মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ছিল। অর্থাৎ তখনো বৃষ্টি হতো।
সূর্যের আলোর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমেছে শীতকালে। এর মধ্যে গত ৪০ বছরে রংপুর বিভাগে সূর্যালোক সবচেয়ে বেশি কমেছে। এরপর সূর্যালোক কমেছে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে। অন্যদিকে মেঘের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি হারে বেড়েছে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগে।
গবেষণায় তাপমাত্রার পরিবর্তন বুঝতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩৫টি স্টেশনের ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের প্রতিদিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দেখা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ঋতুতে তাপমাত্রার পরিবর্তনের দিকটি উঠে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, ক্রমেই জলবায়ু পরিস্থিতি উষ্ণ হচ্ছে। সব ঋতুতেই তাপমাত্রা আগের চেয়ে বাড়ছে। ঢাকার তাপমাত্রার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৪০ বছরে দেখা গেছে প্রাক-বর্ষা, বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী তিন সময়েই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৯, শূন্য দশমিক ৩৩ এবং শূন্য দশমিক ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু শীতকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে গেছে শূন্য দশমিক ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে চারটি কালেই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে। দেখা গেছে, ঢাকাসহ আট বিভাগেই বর্ষাকালে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে। এর মধ্যে খরাপ্রবণ রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টিবহুল সিলেটেও এ সময় তাপমাত্রা বেড়েছে একই রকম মাত্রায়। ঢাকা, রংপুর ও চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির এ হার ছিল শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুম, তাপপ্রবাহ, শীতের ধরনসহ কয়েকটি বিষয়কে মাথায় রেখে গবেষণাটি করা হয়েছে। দেশে তাপপ্রবাহের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আবার শীতের মধ্যেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখছি। চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে দেশে। বর্ষা আসার সময় পাল্টেছে। বিলম্ব হচ্ছে চলে যেতেও। শুধু বর্ষা নয়, শীত বা গ্রীষ্মেও বেড়ে যাচ্ছে তাপ। মেঘাচ্ছন্ন দিনের পরিমাণ বাড়ছে। তাতে শীতের দিন তাপ বাড়লেও শীতের তীব্রতার অনুভূতি হচ্ছে বেশি মাত্রায়। এর সঙ্গে বাড়ছে বায়ুদূষণ।
তিনি বলেন, নরওয়ের সরকার ১৩ বছর ধরে আবহাওয়া-সংক্রান্ত গবেষণায় বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরকে সহায়তা করছে। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতা বুঝতে সেই সহায়তা খুব কার্যকর হয়েছে।
নরওয়ের আবহাওয়া দপ্তরের জলবায়ু বিভাগের প্রধান হ্যান্স অলিভ হাইজেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন যে ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে রক্ষা পেতে ভবিষ্যতের জন্য কোনো কিছু ফেলে রাখার কোনো অবকাশ নেই। ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে। রাজশাহীসহ বিভিন্ন প্রান্তে তাপপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ভবিষ্যতে বৃষ্টির সময়ও কমে আসতে পারে। গরমের সময় বাড়বে। আবার দেখা যাবে, অনেক গরমের পর হঠাৎ অস্বাভাবিক বৃষ্টি হতে পারে। এমন বৈরী পরিস্থিতি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার বিষয়।
বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিক্টার সেভেন্ডসন বলেন, আমাদের একটাই পৃথিবী। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব থেকে আমরা কেউ মুক্ত থাকতে পারব না। বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে কার্যকর বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন রাষ্ট্রদূত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন ফাতিমা আকতার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ভবিষ্যতে।