আইনজীবী বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হাবিবা হীরা চৌধুরী। ছয় বছর সাত মাস বয়সী ফুটফুটে শিশুটি বাসাজুড়ে ‘আলো’ ছড়াত। রাজধানীর গ্রিন রোডের সেই বাসা এখন শোকে অন্ধকার। ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে ছোট্ট হাবিবাকে। তবে স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসা অবহেলায় অকালেই নিভে গেছে ওর জীবন প্রদ্বীপ। এবারও অভিযোগের তীর সেই সেন্ট্রাল হাসপাতালের দিকে।
হাবিবার মা অ্যাডভোকেট সুফিয়া পারভীন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলায় তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। অনুরোধ করেই চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছিল না। নার্সরাই মেয়ের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। যখন কিছুই করার ছিল না, তখন তাদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে তো আর ফেরত পাব না; কিন্তু অন্য কোনো মায়ের বুক যাতে তার মতো শূন্য না হয়, সেজন্য তিনি হাসপাতালটির সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করবেন।’
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এবং হাবিবার চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় গত ৭ জুলাই শুক্রবার দুপুরে শিশুটিকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে ডা. এ এফ এম সেলিমের অধীনে চতুর্থতলায় ৫২২ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিল। অবস্থার অবনতি হতে থাকলে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সোমবার শিশুটিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সাপোর্ট রয়েছে, এমন হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দেয়। তখন স্বজনরা তাকে মহাখালীতে ইউনিভার্সেল হাসপাতালে নিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করেন। পরের দিন সেখানে মৃত্যু হয় শিশুটির।
হাবিবার এক স্বজন বলেন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তির পর তিন দিনের মাথায় জ্বর নেমে যায়। তখন ডিউটি ডাক্তার বলেছিলেন, বিপদমুক্ত। কিন্তু হাবিবা হঠাৎ করে কালো রঙের পায়খানা করে। তখন দায়িত্বরত নার্সদের এর কারণ জিজ্ঞেস করে তা পরীক্ষার অনুরোধ জানানো হয়। তারা তা করেননি। বারবার দৌড়ঝাঁপ করেও চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। যখন কিছুই করার ছিল না, তখন চিকিৎসক এসে জানান, হাবিবার রক্তচাপ নেমে গেছে। তাকে দ্রুত আইসিইউ সাপোর্ট দিতে হবে। কিন্তু সেন্ট্রাল হাসপাতালে আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই। এরপর তারা বাধ্য হয়ে একেবারে শেষ সময়ে তাকে অন্য হাসপাতালে নেন।
অবহেলায় শিশুমৃত্যুর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্ট্রাল হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এমএ কাশেম দাবি করেন, আমরা উন্নত ও সর্বাধুনিক সেবা দিয়ে থাকি। ডেঙ্গু রোগীকে নার্সরা চিকিৎসা দিয়েছেন—এটা সঠিক নয়। তিনি বলেন, একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর এখন সবাই সুযোগ পেয়ে বসেছে। যেটা স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য দুঃখজনক।
১১ জুন সেন্ট্রাল হাসপাতালে অস্ত্রোপচারে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে ওই নবজাতকের মা মাহবুবা রহমান আঁখিও মারা যান। ভুল চিকিৎসা এবং অবহেলার অভিযোগ উঠে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সেখানে অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ওই ঘটনায় মামলা হলে দুই চিকিৎসকও গ্রেপ্তার হন। ওই ধাক্কা না কাটতেই এবার অবহেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ মিলল হাসপাতালটির বিরুদ্ধে।
মন্তব্য করুন