

অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে এমনিতেই গ্যাসের চাপ কিছুটা কম থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসের ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহেও দেখা দিয়েছে সংকট। দুটোতেই সংকট দেখা দেওয়ায় ঢাকা জুড়ে বাসিন্দারা প্রতিদিনের রান্না চালাতে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ খুব কমে গেছে, কোথাও আবার পুরোপুরি বন্ধ। বাধ্য হয়ে অনেকেই বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। আর দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হলেও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নিম্ন আয়ের মানুষরা বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা বেছে নিচ্ছেন। বাজারে দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা পাওয়া যায়। ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড। চুলা দুটি বিদ্যুতের সাহায্যে চললেও ব্যবহারের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
কী সেটা? চলুন তাহলে জেনে নিই—
ইনফ্রারেড কুকার কী?
বর্তমান সময়ে রান্নাঘরের যন্ত্রপাতিতে এসেছে নানা ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি। প্রতিটি যন্ত্রেরই রয়েছে আলাদা আলাদা সুবিধা ও ব্যবহারিক গুরুত্ব। এ তালিকায় তুলনামূলক নতুন সংযোজন হলো ইনফ্রারেড কুকার। এটি এমন এক আধুনিক রান্নার যন্ত্র, যা সরাসরি আগুন বা তাপের পরিবর্তে ইনফ্রারেড তরঙ্গের মাধ্যমে খাবার গরম ও রান্না করে। ফলে খুব অল্প সময়েই খাবার প্রস্তুত করা সম্ভব হয়, ঝামেলাও কম। যারা দ্রুত ও সহজে রান্না করতে চান, তাদের জন্য ইনফ্রারেড কুকার দারুণ একটি সমাধান। এ ধরনের কুকারে রান্নার পর হাঁড়ি-পাতিলে অতিরিক্ত তাপ জমে থাকে না। তাই যাদের তাপ বা ধোঁয়ার প্রতি অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি বেশ নিরাপদ ও আরামদায়ক।
ইনডাকশন কুকার কী?
কয়েক বছর ধরেই রান্নাঘরগুলোতে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ইনডাকশন কুকার। আধুনিক রান্নাঘরেও এই কুকার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এর জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের কারণে।
ইনডাকশন কুকার রান্না করে চৌম্বক ক্ষেত্রের মাধ্যমে। এ প্রযুক্তিতে তাপ সরাসরি হাঁড়ি বা পাত্রে তৈরি হয়, ফলে তাপের সঞ্চালন হয় দ্রুত ও সমানভাবে। এর ফলে খাবার যেমন ভালোভাবে রান্না হয়, তেমনি স্বাদ ও গুণগত মানও বজায় থাকে।
প্রচলিত গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলার তুলনায় ইনডাকশন কুকারে খাবার কম সময়েই রান্না হয়। পাশাপাশি এতে জ্বালানি অপচয় কম হয়, যা একে করে তোলে আধুনিক ও টেকসই রান্নার একটি কার্যকর সমাধান।
সহজ ব্যবহার, দ্রুত রান্না ও পরিচ্ছন্নতার সুবিধার কারণে ব্যস্ত জীবনে ইনডাকশন কুকার এখন অনেক পরিবারের নির্ভরতার নাম।
ইনডাকশন কুকার ও ইনফ্রারেড কুকারের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
দেখতে প্রায় একই রকম হলেও ইনডাকশন কুকার ও ইনফ্রারেড কুকার—এ দুই আধুনিক রান্না প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
ইনফ্রারেড কুকার রান্নার সময় দ্রুত, নির্ভুল ও সহজে নিয়ন্ত্রিত তাপ সরবরাহ করে। রান্নার সময় এর কুকটপে স্পষ্ট লাল আলো দেখা যায়। কারণ, এতে ব্যবহৃত হয় রেডিয়েন্ট কয়েল ও হ্যালোজেন ল্যাম্প, যা সরাসরি পাত্রে তাপ পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে ইনডাকশন কুকার চালু থাকলেও অনেক সময় সেটি বাইরে থেকে তেমন বোঝা যায় না। কারণ, এখানে খোলা তাপ নয়—চৌম্বকীয় প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
পরিবেশগত দিক থেকেও ইনফ্রারেড কুকার তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব। এটি তাপ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনে। তবে ইনডাকশন কুকার খুব দ্রুত গরম হয় এবং শুধু উপযোগী (ম্যাগনেটিক) পাত্রেই তাপ সৃষ্টি করে, যা একে আরও নিরাপদ করে তোলে।
রান্নার মানের ক্ষেত্রে ইনফ্রারেড কুকারের একটি বড় সুবিধা হলো—এতে খাবার সমানভাবে রান্না হয়। তাপমাত্রা ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় খাবার অতিরিক্ত সিদ্ধ বা স্বাদহীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। অন্যদিকে ইনডাকশন কুকারকে ধরা হয় সবচেয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ী কুকটপগুলোর একটি, যদিও খাবার সমানভাবে রান্নার ক্ষেত্রে ইনফ্রারেড কিছুটা এগিয়ে।
নিরাপত্তার দিক থেকে ইনডাকশন কুকারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো—এটি নিজে খুব বেশি গরম হয় না, ফলে রান্না পোড়া লাগার ঝুঁকি কমে যায়। ইনফ্রারেড কুকার তুলনামূলকভাবে বেশি গরম হয়, তাই ব্যবহারে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, প্রতিটি কুকারেরই রয়েছে কিছু সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা। তবে আধুনিক রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি কেনার সময় ইনফ্রারেড কুকারও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনি খাবারের সমান রান্না ও নিয়ন্ত্রিত তাপকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ইনডাকশন কুকারের সুবিধা
আধুনিক রান্নাঘরে ইনডাকশন কুকার জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু ব্যবহারিক সুবিধা।
ইনডাকশন কুকটপ খুব দ্রুত গরম হয়, ফলে রান্নার প্রস্তুতিও হয় তাড়াতাড়ি।
দ্রুত তাপ সঞ্চালনের কারণে এতে রান্নার সময় প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমে যায়।
এটি শুধু নির্দিষ্ট ধরনের (চৌম্বকযুক্ত) পাত্রে কাজ করে, যা রান্নাকে করে আরও নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ।
খোলা আগুন বা অতিরিক্ত তাপ না থাকায় পোড়া লাগা বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
সমতল পৃষ্ঠের কারণে পরিষ্কার করা খুব সহজ—একটি কাপড়ে মুছলেই হয়ে যায়।
ধোঁয়া বা আগুন তৈরি না হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব এবং স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার নিশ্চয়তা দেয়।
ইনফ্রারেড কুকারের সুবিধা
ইনফ্রারেড কুকার দ্রুত ও সমান রান্নার জন্য পরিচিত। এর কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো—
ইনডাকশন কুকারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ দ্রুত অধিকাংশ খাবার রান্না করতে পারে।
এটি সরাসরি রান্নার পাত্রে তাপ দেয়, ফলে রান্নাঘর অতিরিক্ত গরম হয় না এবং পরিবেশ থাকে আরামদায়ক।
খাবার সমানভাবে রান্না হয়, কোথাও বেশি বা কম সিদ্ধ হওয়ার ঝামেলা থাকে না।
রান্নার সময় খাবারের আর্দ্রতা (ময়েশ্চার) বেশি বজায় থাকে, ফলে স্বাদ থাকে ভালো।
ইনফ্রারেড কুকার হালকা ও বহনযোগ্য, তাই ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় ব্যবহার করা যায়।
শুধু ঘরের রান্নাঘর নয়—আরভি, নৌকা, ডরমিটরি, ক্যাম্পিং বা ভ্রমণের সময়ও ইনফ্রারেড কুকার বেশ উপযোগী।
মন্তব্য করুন