ইউসুফ আরেফিন
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:৪০ এএম
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:২৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো তালিকাই হলো না

কোনো তালিকাই হলো না

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রায় ১১ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে সরকার। ওই তালিকায় দেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের নাম চলে আসে বলে অভিযোগ ওঠে। তালিকা প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। পরে সেই তালিকা প্রত্যাহার করে নেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর বেশ কয়েকবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছিলেন, নির্ভুল ও প্রকৃত রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। কিন্তু ঘোষণার দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো তালিকা প্রকাশ করতে পারছে না মন্ত্রণালয়। সূত্র বলছে, নির্ভুল তালিকা প্রকাশের চিন্তা থেকেই বিষয়টি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

এদিকে, স্বাধীনতার ৫২ বছরেও দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করতে পারছে না সরকার। এই তালিকা তৈরির দায়িত্ব জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা)। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ১ লাখ ৯২ হাজার ১৫৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে যুক্ত হয়েছে।

রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে জাতীয় সংসদে নিজ দল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিতর্কিত তালিকা প্রকাশে মন্ত্রী দায় এড়াতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা। ওই তালিকায় বহু মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধে শহীদদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজাকারের তালিকাসহ অনেকেই স্ট্যাটাস দিয়ে তাদের উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। বিতর্কের মুখে তিন দিন পর ওই তালিকা প্রত্যাহার করে নেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব এস এম আরিফুর রহমান এবং মন্ত্রী মোজাম্মেল হক একাধিকবার বলেছিলেন, রাজাকারের নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করবে সরকার।

একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, রাজাকারের ত্রুটিযুক্ত তালিকা প্রকাশ করে সমালোচনা হয়েছিল। নতুন তালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও কিছু ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তালিকা তৈরির সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তালিকায় অনেকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আর বিতর্কের জন্ম দিতে চায় না। তা ছাড়া স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারকার্য চলমান রয়েছে। সুতরাং আলাদা করে তালিকা প্রকাশের দরকার নেই বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। তবে সরকার তালিকা প্রকাশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

এদিকে, প্রকাশিত তালিকা নিয়ে বিতর্কের পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উদ্যোগে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধীদের তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য একটি সাব-কমিটিও গঠন করা হয়। সাব-কমিটির আহ্বায়ক হন সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাজাহান খান। আর সদস্য হন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ ও আওয়ামী লীগের ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম।

কাজী ফিরোজ রশীদ কালবেলাকে বলেন, এটি অনেক কঠিন কাজ ছিল। তবুও আমরা তালিকা তৈরির কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ করেছি। একটি তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। এরপর মন্ত্রণালয় আর আমাদের ডাকেনি। আর কোনো বৈঠক হয়নি। যতদূর জানি তালিকা তৈরির আর কোনো অগ্রগতি নেই।

তালিকা প্রকাশ করা হবে জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ভবিষ্যতে যেন ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য সবার সাহায্য নিয়ে যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২০১৯ সালের প্রকাশিত বিতর্কিত ওই তালিকা তার মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করেনি দাবি করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চাহিদার ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ এটি পাঠিয়েছে। ওই তালিকা হুবহু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে। এই তালিকা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তৈরি করেনি, এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কবে:

দেশ স্বাধীনের ৫২ বছর শেষ হয়ে ৫৩ বছরে পড়ছে। এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শেষ করতে পারছে না মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউই।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২৬ মার্চের আগেই হয়তো মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির কাজ শেষ করতে পারবে সরকার। গত নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৯২ হাজার ১৫৫ জন। আর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের উপকারভোগীর সংখ্যা বর্তমানে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪১ জন। পূর্ণাঙ্গ তালিকা ২ লাখের মধ্যেই থাকবে বলে মনে করছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট শাখার হিসাবে, বিভিন্ন সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৭ জনের নাম গেজেটভুক্ত হয়েছিল। পরে তাদের অনেকের নামই বাতিল হয়েছিল। বর্তমানে ১ লাখ ৯২ হাজার ১৫৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের ভাষ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। পূর্ণাঙ্গ তালিকায় সংখ্যাটি ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি হবে না। শিগগির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের বিষয়ে আশাবাদী সরকারের এই সিনিয়র মন্ত্রী।

কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সরকারের আমলে পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে প্রথম জাতীয় কমিটি ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রকাশ করে। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০ হাজার ৮৯২ জন। ১৯৯৪ সালের তৃতীয় তালিকায় ৮৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম যুক্ত হয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে চতুর্থ তালিকায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫২ জনের নাম মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত হয়। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনে।

২০১১ সালে ষষ্ঠ দফার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৫ জন দেখানো হয়। তবে সর্বশেষ গত নভেম্বর পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৯২ হাজার ১৫৫ জন। তাদের মধ্যে খেতাবপ্রাপ্ত, শহীদ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আছেন ১০ হাজার ৯৯৬ জন। এ ছাড়া বীরাঙ্গনা, প্রবাসী সংগঠক, শব্দসৈনিক, বিভিন্ন বাহিনীর বেসামরিক ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। এখন পর্যন্ত ৪৭৩ জন বীরাঙ্গনা, ১৭ জন প্রবাসী সংগঠক, ২৯৬ জন শব্দসৈনিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ খতিয়ে দেখা হচ্ছে: জয়সোয়াল

৫০ বছর ইমামতির পর অবসর, ঘোড়ার গাড়িতে ইমামকে রাজকীয় বিদায়

মসজিদের ইমামকে ঘিরে বিরোধে ভেতরে বিএনপি, বারান্দায় জামায়াতের নামাজ আদায়

ডোপ কেলেঙ্কারিতে ৩ মাসের জন্য পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নিষিদ্ধ করল আইসিসি

হাতিয়ায় বেড়িবাঁধ ছিঁড়ে ৩ গ্রাম প্লাবিত, রাতে বহু ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা

প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেন ট্রেন চালু করল ভারত

ফাইনালে উঠেও যেভাবে গোল্ডেন বুট হারাতে পারেন মেসি

বিশ্বকাপের শেষ দুই ম্যাচ ঘিরে ঢাবিতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি ডাকসুর

১৫ জুলাই হামলার বিচার দাবিতে ডাকসুর ‘নমরুদনামা’ ব্যানারিং কর্মসূচি

বিএনপির উচিত দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে না দেওয়া: গোলাম পরওয়ার

১০

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ

১১

তারুণ্যের উদ্ভাবন ও স্টার্টআপের বার্তা নিয়ে ঢাবিতে ছাত্রদলের প্ল্যাকার্ড কর্মসূচি

১২

ইংল্যান্ডকে আর্জেন্টাইন মিডিয়ার ‘খোঁচা’

১৩

৩২ লাখের ফাইল গায়েব / জনদুর্ভোগের সেই ‘পাথর’ অপসারণ করছে পৌরসভা

১৪

স্বরূপে ফিরল টাইগাররা, সিরিজে এলো সমতা

১৫

চট্টগ্রামে বন্যাদুর্গত খামারিদের মধ্যে ৪০০ বস্তা গোখাদ্য বিতরণ

১৬

ইরাকের এরবিলে ইরানের ছোড়া আট ড্রোন ধ্বংসের দাবি

১৭

ঢাকাস্থ যশোর সাংবাদিক ফোরামের ফল উৎসব অনুষ্ঠিত

১৮

পুকুরে বিষ দিয়ে মাছ নিধন, অঝোরে কাঁদছেন চাষি রনি

১৯

এনএসইউতে বিশ্বকাপ কুইজ: স্কুল-কলেজের হাজারো শিক্ষার্থীর মিলনমেলা

২০
X