লক্ষ্মীপুরের প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দার চিকিৎসার একমাত্র আস্থা লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল। জেলার ৫টি উপজেলার চারটিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও জনসাধারণের ভরসা যেন সদর হাসপাতালটি। প্রতিদিন এ হাসপাতালটির আউটডোরে হাজারেরও বেশি রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে। এ ছাড়া হাসপাতালে ধারণক্ষমতার তিন থেকে চারগুণ রোগী ভর্তি থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৪২ জন। শয্যার বিপরীতে এত পরিমাণ রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে দেখা গেছে কর্তব্যরত চিকিৎসক এবং নার্সদের।
বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) সরেজমিনে দেখা গেছে, মেডিসিন পুরুষ ও সার্জারি বিভাগে ৩০টি করে ৬০টি বেড রয়েছে। এ ৬০ বেডের বিপরীতে ১২৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। শিশু ও গাইনি ওয়ার্ডে ৩০ বেডের বিপরীতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১১১ জন। এভাবে প্রায় সব ওয়ার্ডেই ধারণক্ষমতার চেয়েও অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকতে দেখা গেছে।
ভর্তিকৃত শয্যার অতিরিক্ত থাকা প্রায় আড়াই গুণ রোগীর বিছানা পাতা হয়েছে ফ্লোর, চলাচল পথ ও লাশঘরের সামনে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এবং গরমে রোগীদেরও নানা ভোগান্তি পোহাতে দেখা গেছে।
রোগীর চাপের বিপরীতে শয্যা সংকটের সঙ্গে আছে চিকিৎসক সংকট। জটিল রোগের চিকিৎসক না থাকায় ওইসব রোগাক্রান্ত রোগী হাসপাতাল থেকে সেবা নিতে পারছেন না। ফলে অনেক জটিল রোগের রোগীদের চিকিৎসা নিতে হয় প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যার সদর হাসপাতালে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। গুরুতর রোগীদের ভর্তি রাখতে হয়। কেউ আবার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আউটডোরে চিকিৎসাপত্র নেন রোগীরা।
হাসপাতালে আসা জেসমিন আক্তার নামে এক নারী বলেন, আমার শিশুপুত্র ইয়াছিনের নাকে সমস্যা থাকায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু বেড না থাকায় আমাদের মেঝেতে বিছানা করে দিয়েছে। গত তিন দিন ধরে মেঝেতে থেকে ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছি।
পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী নুর নবী বলেন, বেড নেই। যে পরিমাণ রোগী, তাতে বেড থাকবে কী করে? তাই মেঝেতে ঠাঁই হয়েছে।
আয়েশা নামে এক নারী জানান, তার বৃদ্ধ স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। মেঝেতে শয্যা দেওয়া হয়েছে। ফ্যানের বাতাস পর্যাপ্ত না হওয়ায় কাগজের সাহায্যে তাকে বাতাস করতে হচ্ছে।
সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) অরুপ পাল বলেন, সদর উপজেলার রোগী ছাড়াও জেলার সবকটি উপজেলার রোগীরা এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো থেকে এ হাসপাতালে রোগীদের রেফার করা হয়। প্রতিদিন এ হাসপাতালে রোগীদের অনেক চাপ থাকে। শয্যার বিপরীতে রোগীর পরিমাণ তিন থেকে চার গুণ হওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। নির্মাণাধীন আড়াইশ শয্যার ভবনটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। সেটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হলে শয্যা সংকট সমাধান হবে।
জেলা সদর হাসপাতালটি আড়াইশ শয্যায় উন্নীত হলেও এখানে একশ শয্যার জনবলও নেই। একশ শয্যার মঞ্জুরীকৃত ১৫৪ জনবলের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১০৬ জন। গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক পদও শূন্য। আবার কোনো চিকিৎসক ছুটিতে গেলে ওই চিকিৎসকের সেবা বন্ধ থাকে। সেবা না নিয়েই ফিরে যেতে হয় রোগীদের।
জেলা শহরের বাসিন্দা সুমন দাস বলেন, সোমবার একজন রোগীকে নিয়ে সার্জারি চিকিৎসকের কক্ষে যাই। কিন্তু ওই চিকিৎসক ছুটিতে থাকায় সেবা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল রোগের চিকিৎসকের অনেকগুলো পদ শূন্য থাকায় বাইরের হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সিনিয়র কনসালটেন্টের চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। জুনিয়র কনসালটেন্ট পদে ৯ জনের থাকার কথা থাকলেও আছেন ৬ জন। সিনিয়র স্টাফ নার্স ও স্টাফ নার্স ৮২ জনের বিপরীতে ৬৪ জন কর্মরত রয়েছেন। ৬টি মিডওয়াইফ পদ একেবারে শূন্য। এ ছাড়া অন্যান্য পদে ৪১ জনের জায়গায় ২৩ জন কর্মরত রয়েছেন।
জানা গেছে, হাসপাতালে সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, মেডিসিন, ইএনটি, চক্ষু ও জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলেশন পদে কোনো চিকিৎসক নেই। দীর্ঘদিন ধরে পদগুলো শূন্য থাকায় রোগীরা সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীর চারটি পদের মধ্যে মাত্র একজন কর্মরত রয়েছেন। ফলে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা পরিবেশ দেখা গেছে। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার অরুপ পাল বলেন, কিছু পদে চিকিৎসক না থাকায় রোগীরা ওইসব রোগের সেবা পাচ্ছেন না। তবে আমরা যথাসাধ্য সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। শূন্য পদে জনবল পেতে জেলা সিভিল সার্জন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন