মোমিন শেখ, রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

কাজে আসছে না কোটি টাকার ফগ লাইট, দায় নিচ্ছে না কেউ!

ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট। ছবি : কালবেলা
ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট। ছবি : কালবেলা

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট। অথচ এই নৌরুটে শীত এলেই থমকে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঘনকুয়াশায় প্রায় নিয়মিতই বন্ধ থাকে ফেরি চলাচল। যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি কমাতে প্রায় এক দশক আগে বসানো ৫ কোটি টাকার ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট আজ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের ১০টি ফেরিতে উন্নত প্রযুক্তির ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট স্থাপন করে। উদ্দেশ্য ছিল— শীত মৌসুমে ঘনকুয়াশাতেও নিরাপদে ফেরি চলাচল অব্যাহত রাখা। সে সময় প্রকল্পটি ঘিরে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই আলো আর নৌপথ দেখাতে পারেনি।

দুই সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা ফেরি অচল, ঘনকুয়াশার কারণে গত দুই সপ্তাহে এই নৌরুটে প্রায় ৬০ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে উভয় ঘাটে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। বাস, ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী যানসহ হাজারো যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়ে। যাত্রীদের মধ্যে দেখা দেয় চরম ভোগান্তি, অসুস্থ রোগী পরিবহনে সৃষ্টি হয় মারাত্মক ঝুঁকি।

চালকরা জানান, কুয়াশা একটু ঘন হলেই ফেরি বন্ধ ঘোষণা আসে। অথচ কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো ফগ লাইট থাকলে এমন পরিস্থিতির কথা ছিল না।

দায় চাপানো আর নীরবতা, ফগ লাইট বিকল থাকার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সমাধান দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিসি ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে দেখা গেছে দায় চাপানোর প্রবণতা।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস বলেন, এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলুন।

আর বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, এ বিষয়টি মূলত কারিগরি বিভাগের।

অন্যদিকে কারিগরি বিভাগের দাবি, জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই কুয়াশায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হচ্ছে। ঘনকুয়াশায় দৃশ্যমানতা একেবারে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের ভাইয়ের ঠিকাদারিতে স্থাপিত ফগ লাইটগুলো শুরু থেকেই মানহীন ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। অনেকের দাবি, এই ফগ লাইট কখনোই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়নি। ফলে প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে যায়।

একজন নিয়মিত যাত্রী বলেন, প্রতিবার শীত এলেই একই নাটক। কোটি টাকা খরচের কথা শুধু কাগজে আছে, মাঠে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

২১ জেলার মানুষের ভোগান্তি, রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জ জেলার পাটুরিয়া ঘাট দিয়ে প্রতিদিন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ রাজধানীতে যাতায়াত করে। এই নৌরুটে ফেরি বন্ধ মানেই অর্থনীতি, চিকিৎসা, ব্যবসা ও নিত্যপণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নৌরুটে আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম, কার্যকর ফগ লাইট ও বিকল্প প্রযুক্তি চালু করা জরুরি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহির অভাবে বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের দাবি, যাত্রী, চালক ও স্থানীয়দের দাবি—অকার্যকর ফগ লাইট প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দ্রুত মেরামতের মাধ্যমে নৌরুটে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হোক। নচেৎ প্রতিবছর শীত এলেই দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌরুটে অচলাবস্থা আর দুর্ভোগ যেন অনিবার্য নিয়তি হয়েই থাকবে।

জানা গেছে, কুয়াশার মধ্যে নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু রাখতে ২০১৫ সালে ১০ টি ফেরিতে পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ফগ লাইট’ স্থাপন করেছিল নৌ মন্ত্রণালয়। সাড়ে সাত হাজার কিলোওয়াটের প্রতিটি ফগ লাইটের ক্রয় বাবদ খরচ ধরা হয়েছিল অর্ধকোটি টাকার ওপরে। কিন্তু স্থাপনের পর থেকেই মূল্যবান ওই ফগ লাইটগুলো বিকল হয়ে আছে।

বিআইডব্লিউটিসির সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের জুন মাসে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে দরপত্রের মাধ্যমে ১০টি ফেরিতে ক্ষমতাসম্পন্ন ফগ লাইট বসানো হয়। একেকটি ৭ হাজার কিলোওয়াটের লাইট কিনতে ৫০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। বলা হয়েছিল, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। অথচ কয়েক দিন পরই অধিকাংশ লাইট নষ্ট হয়ে যায়।

এর আগে, ঘনকুয়াশার কারণে প্রায় টানা পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে চারটার দিকে কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় নৌপথে দৃশ্যমানতা কমে গেলে যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ।

কুয়াশার ঘনত্ব কমে আসায় বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ১৫টি ফেরি দিয়ে পুনরায় পারাপার শুরু হয়। ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় ঘাট এলাকায় আটকে পড়া যানবাহন ও যাত্রীরা স্বস্তি ফিরে পান। তবে টানা ৫ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধের কারণে দৌলতদিয়া ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়।

মেহেরপুর থেকে ছেরে আসা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের এক পরিবহন চালক কালবেলাকে বলেন, সরকার যে ফগ লাইট টা দিয়েছে কুয়াশার জন্য। সেটা তো ফেরিতে ব্যবহার করে না। যদি করত তাহলে তো কুয়াশার জন্য ফেরি বন্ধ থাকত না। এটার জন্য তো আর বিকল্প কেউ কথাও বলবে না, যদি কথাও বলে তাহলে কে বলবে। আমাদের কথা তো কেউ শুনবে না।

সোহাগ নামের আরেক চালক কালবেলাকে বলেন, ফগ লাইট ব্যবহার হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, ফেরি চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। কুয়াশার জন্যই তো ফগ লাইট দেওয়া সেটা যদি ব্যবহারই না করে তাহলে সেটা দেওয়ার দরকার কী ছিল। আমরা চাই সবসময়ই ফেরি চলাচল থাকুক।

স্থানীয় এক বাসিন্দা সুজ্জল মাহমুদ বলেন, আমরা জানি প্রত্যেকটা রোরো বড় ফেরিতে ফগ লাইট লাগানো হয়েছে, কুয়াশা পড়লে ওই ফগ লাইটটা জ্বালালে নির্বিঘ্নে ফেরি চলাচল করতে পারবে। কুয়াশা পড়লে ফেরি বন্ধ হয়ে যায়। আসলে এই ফগ লাইটগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। এখানে কোটি কোটি টাকা সরকার ব্যয় করছে। শীতের মৌসুমে যতদিন কুয়াশা পড়ছে কোনদিন আমি দেখিনি, এই নদীতে কুয়াশার মধ্যে ফগ লাইট ব্যবহার করে ফেরি চলাচল হইছে। আমার হিসেবেই আসে না সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেন এ ফগ লাইটগুলো লাগায়ছে!

যেসব ফেরিতে ফগ লাইট স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে রো রো ফেরির এক মাস্টার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইনচার্জ (মাস্টার) কালবেলাকে বলেন, কয়েক বছর আগে ১০টি ফেরিতে কুয়াশার ফগ লাইট স্থাপন করা হয়। কয়েক দিন পরই এই ফেরির লাইট নষ্ট হয়ে যায়। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সমাধান হয়নি। এ ছাড়া এই লাইট দিয়ে ভারি বা মাঝারি কুয়াশার মধ্যেও চলাচল করা যায় না। সাধারণ হালকা কুয়াশা হলে সেটা কিছুটা কাজে লাগে। এর চেয়ে পুরোনো সার্চ লাইটগুলোই অনেক কার্যকর।

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন কালবেলাকে জানান, ফগ লাইটের বিষয়ে দৌলতদিয়া প্রান্তে কোনো কাগজপত্র বা ফাইল নেই। এ বিষয়ে আপনাকে দেওয়ার মতো কোন তথ্য আমার কাছে নেই। আপনি কারিগরি, নৌ ও টেকনিক্যাল বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস কালবেলাকে জানান, এটা তো নিউজ হয়েছে একবার। আপনি দেখেছেন, পরে এ বিষয়ে কথা হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, মরদেহ মিলল নদীতে

আজ রাত থেকেই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে : ইরান

দেশে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

শ্রীমতী অনিমা রানী রাহার পরলোকগমন

আয়ারির জোড়া গোলে তিউনিশিয়াকে উড়িয়ে দিল সুইডেন

মেট্রোরেলের ৯ স্টেশন ও গুলশানে ফ্রেশ সুপার মার্ট চালু করল এমজিআই

ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে ৪ দেশ

বাঁচতে চায় আবু বক্কর, সাহায্যের আবেদন

পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ইরানের সঙ্গে দুই ঘণ্টাও টিকতে পারত না ইসরায়েল : ট্রাম্প

বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মাঠে ঢুকতে না দেওয়ার অনুরোধ

১০

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির কারণে ক্ষুব্ধ ইসরায়েলি ডানপন্থিরা

১১

জয়পুরহাটে হাট-বাজারে মাছ ধরার চাঁই বিক্রির ধুম

১২

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বিধ্বস্তে ১২ আরোহীর মৃত্যু

১৩

পার্থকে সভাপতি করে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন

১৪

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির খবরে কমেছে তেলের দাম

১৫

শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে তিউনিশিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে সুইডেন

১৬

পুষ্টিগুণে ভরপুর দেশি ফল ডেউয়া

১৭

শেষ মুহূর্তে গোল, জয় দিয়েই আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু

১৮

যে দলগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গোল খেয়েছে আর্জেন্টিনা

১৯

আরব সাগরে আটকে পড়া ১৪ ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করল যুক্তরাষ্ট্র

২০
X