

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মহাসড়কে মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে অভিযান চালিয়ে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়। এর আগে শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে ঢাকা শরীয়তপুর মহাসড়কের জাজিরা কলেজ ও মতিসাগর এলাকায় অভিযান চালায় জাজিরা থানা পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি জাজিরার বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করে।
শুক্রবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, জাজিরা কলেজ এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মহাসড়কে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরে সেখানে অভিযান চালানো হলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মিছিলের প্রস্তুতিতে থাকা নেতাকর্মীরা পালিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকা থেকে কয়েকজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
শনিবার সকালে জাজিরা থানার উপসহকারী পরিদর্শক হিমায়েত হোসেন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রথমে আটক ৬ জনসহ পরে আরও ২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, নড়িয়া উপজেলার ডগ্রী মোচেন ঢালী কান্দি এলাকার আর্শেদ আলী সরদারের ছেলে আতাহার সরদার (২৬), জাজিরা উপজেলার মোল্লাকান্দি এলাকার চুন্নু মাদবরের ছেলে তুলন মাদবর (১৯), নড়িয়া উপজেলার ডগ্রী মোচেন ঢালী কান্দি এলাকার আমির হোসেনের ছেলে নাহিদ হাসান সরদার (২২), জাজিরা উপজেলার দক্ষিণ ডুবলদিয়া এলাকার বিল্লাল শিকারির ছেলে শাকিল শিকারি (২০), জাজিরার বালিয়াকান্দি এলাকার দানেশ শেখের ছেলে জয় শেখ (২৬), শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিকন্দী এলাকার খোকন খানের ছেলে লিয়াকত খান (২১), জাজিরার গজনাইপুর এলাকার টিটন মোল্লার ছেলে রিফাত মোল্লা (২০) এবং নড়িয়া উপজেলার নয়ন মাদবর কান্দি এলাকার মজিবর সরদারের ছেলে সাব্বির সরদার (২৪)।
স্বজনদের অভিযোগ, আটক হওয়া অধিকাংশই বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রকৃত অভিযুক্তদের ধরতে না পেরে সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার শাকিল শিকারির বাবা বিল্লাল শিকারি বলেন, ‘আমার ছেলে রুপবাবুরহাটে একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করে। শুক্রবার মোটরসাইকেলে তার চাচাতো বোনকে দিতে জাজিরা কলেজ এলাকার চাচার বাড়িতে গিয়েছিল। ফেরার পথে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। সে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়।’
আতাহার সরদারের বোন ফারজানা বলেন, ‘আমার ভাই আতাহার, সাব্বির ও নাহিদ দিনমজুরের কাজ করে। তারা সেনেরচর এলাকায় আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে পুলিশ তাদের আটক করে।’
নাহিদ হাসান সরদারের বাবা আমির হোসেন সরদার বলেন, আমার ছেলে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে। সে বন্ধুদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছিল। পরে শুনি আওয়ামী লীগের মিছিলের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে। অথচ সে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না।
এদিকে গ্রেপ্তার হওয়া এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর পরিবার অভিযোগ করেছে, মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও তাকে থানায় ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জাজিরার লাউখোলা আইজদ্দিন সরদার উচ্চ বিদ্যালয়ের চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী তুলন মাদবরের এক আত্মীয়কে শুক্রবার আটক করে পুলিশ। ওই আত্মীয়ের খোঁজ নিতে সন্ধ্যায় আরেক আত্মীয় জয় শেখকে সঙ্গে নিয়ে জাজিরা থানায় যান তিনি। পরে থানা থেকেই তাদের আটক করা হয় এবং পরদিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।
তুলনের বাবা চুন্নু মাদবর বলেন, আমার সন্তানকে কোনোদিন একটা থাপ্পড় মারিনি। সে শুধু আত্মীয়ের খোঁজ নিতে থানায় গিয়েছিল। পুলিশ তার পরীক্ষার কাগজপত্রও দেখেছে। তারপরও আমার ছোট ছেলেটাকে জেলে পাঠিয়ে দিল। ওর পরীক্ষা চলছে, এখন কী হবে বুঝতে পারছি না।
লাউখোলা আইজদ্দিন সরদার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘তুলন আমাদের স্কুলের চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী। তার আরও কয়েকটি ব্যবহারিক পরীক্ষা বাকি আছে। সে কি এমন অপরাধ করেছে যে থানা থেকে তাকে আটক করতে হবে। এতে তার শিক্ষাজীবনের বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’
এ বিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ৬ জনকে আটক করা হয়। পরে তদন্তে আরও দুইজনের নাম আসে, তাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এসএসসি পরীক্ষার্থী গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে কেউ নিরপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তাদের মধ্যে কেউ এসএসসি পরীক্ষার্থী আছে বলে আমার জানা নেই।