শরীয়তপুরের জাজিরা থানার বর্তমান ওসি হাফিজুর রহমানের স্ত্রীর শখের বলি হলেন জাজিরার জয়নগর ইউনিয়নের পশ্চিম ছাব্বিশ পাড়া গ্রামের আহসান উল্লাহ মাদবরের ছেলে দ্বীন ইসলাম (৩৫)। কার ড্রাইভিং শিখতে গিয়ে উল্টো দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দ্রুত গতিতে এসে মোটরসাইকেল ড্রাইভার দ্বীন ইসলামের ওপর উঠিয়ে দেন।
গত বছরের ১৯ আগস্ট শরীয়তপুর সদরের চিকন্দি ইউনিয়নের টাউন চিকন্দি এলাকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় দিনমজুর দ্বীন ইসলামের ডান পায়ের হাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সে সময় হাফিজুর রহমান নড়িয়া থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে সকল খরচ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীকে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার অনুরোধ করে মাত্র ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা সহায়তা দেন তিনি।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী দ্বীন ইসলাম দুপুরে শরীয়তপুর পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করবেন বলেও জানান। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওসি হাফিজুর রহমানের স্ত্রী আমার ওপর দিয়ে গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে গাড়ি না থামিয়েই দ্রুত গতিতে পালিয়ে চলে যেতে চাইলে স্থানীয়রা গাড়িটি গঙ্গানগর বাজারে আটক করে। পরে ড্রাইভিং সিট থেকে ওসি হাফিজুর রহমানের স্ত্রী নেমে তার পরিচয় দেন।
এ সময় স্থানীয়রা তাকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ওসির স্ত্রী হিসেবে প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখান। তবে আহত দ্বীন ইসলামকে চিকিৎসার জন্য তার আত্মীয়রা জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে জাজিরা থানার পুলিশ উপপরিদর্শক (এসআই) মতিনের মাধ্যমে মাত্র ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করেন ওসি হাফিজুর রহমান।
ওসি হাফিজুর রহমানের পক্ষে ভুক্তভোগী দ্বীন ইসলামকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া জাজিরা থানার পুলিশ উপপরিদর্শক (এসআই) মতিন কালবেলাকে বলেন, গত আগস্ট মাসে এ ঘটনাটি ঘটলে আমি জানতে পারি। দ্বীন ইসলাম জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পরে তার অবস্থা গুরুতর হলে তাকে ঢাকা পাঠানোর জন্য তৎকালীন নড়িয়া থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করে ১০ হাজার টাকা দিয়ে স্থানীয় মিথুন ঢালীর সহযোগিতা তাকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। এর পরের বিষয়গুলো আমি আর ভালোভাবে জানি না।
পাশাপাশি যাবতীয় চিকিৎসা খরচসহ বিষয়টি দেখারও আশ্বাস দেন ওসি হাফিজুর রহমান। তবে আহত দ্বীন ইসলামের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রায় ২০ দিন সেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ধারদেনা করে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করে ফেললেও ওসি হাফিজুর রহমান কোনো খোঁজই নেননি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওসি হাফিজুর রহমানকে তারা বহুবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি উপায়ান্তর না পেয়ে আহত দ্বীন ইসলামের বাবা আহসান উল্লাহ মাদবর কয়েকবার দেখা করতে গেলেও তার সঙ্গে একবারের জন্যও দেখা করেননি ওসি হাফিজুর রহমান। তাছাড়া দ্বীন ইসলাম ও তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোরও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী পরিবারটি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে দীর্ঘদিন পঙ্গু অবস্থায় ঘরে পড়ে আছেন দ্বীন ইসলাম।
দ্বীন ইসলাম বাবা আহসান উল্লাহ মাদবর (৬৬) ও স্ত্রী রেহানা বেগম (২৫) এবং মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছেলে মেহেদী হাসান (১৩) ও মেয়ে মার্জিয়া (৫) কে নিয়ে ৫ সদস্যের পরিবারটি অত্যন্ত কষ্টে দিনযাপন করছে। দীর্ঘদিন যাবত পঙ্গু হয়ে ঘরে পড়ে থাকায় কোনো কাজ করতে না পারায় টাকা-পয়সার অভাবে রীতিমতো থমকে গিয়েছে তাদের জীবন। চাল-ডাল কিনতে হলেও তাদের এখন হাত পাততে হচ্ছে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে।
দ্বীন ইসলাম জানান, ধারদেনা করতে করতে এরইমধ্যে অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছেন তিনি। সংসারের প্রয়োজনীয় বাজার করার জন্যও কোনো টাকা-পয়সা নেই তার কাছে। এখন ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে তার জন্য। দ্বীন ইসলাম তার ক্ষতিপূরণ দাবি করে বলেন- তারা প্রশাসনের লোক বলে আমি কি ন্যায় বিচার পাব না? আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই, যাতে আর কারও এই ধরনের ক্ষতি না হয়।
ভুক্তভোগী দ্বীন ইসলামের স্ত্রী রেহানা বেগম জানান, আগে তার স্বামী ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে যা রোজগার করতেন তা দিয়ে তাদের সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু ওসি হাফিজুর রহমানের স্ত্রীর শখের বলি হয়ে তার স্বামী পঙ্গু হয়ে ঘরে পড়ে থাকায় এখন তাদের অবস্থা খুবই খারাপ যাচ্ছে। এমনকি টাকার অভাবে এখন চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তার স্বামীর। অথচ ওসি হাফিজুর রহমান আশ্বাস দিয়েছিলেন যাবতীয় খরচ তিনি বহন করবেন।
এ বিষয়ে ওসি হাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে জানান, ওই গাড়িটি আমার স্ত্রীর নয়। ওটা একটা ভাড়া গাড়ি ছিল। দ্বীন ইসলাম আছে কোথায়? দ্বীন ইসলামের মা-বাবাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েন।
নাড়িয়া সার্কেলে দায়িত্বরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আহসান হাবিব মুঠোফোনে কালবেলাকে বলেন, এ ঘটনা আমি আজ শুনলাম। তাছাড়া গত আগস্টের শেষদিকে আমি এখানে যোগদান করেছি।
মন্তব্য করুন