শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২
ঝিনাইদহ ব্যুরো
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৪, ০২:৩১ এএম
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৪, ০৭:২৯ এএম
অনলাইন সংস্করণ

সরল বিশ্বাসে দিলেন সাদা চেক, ৫ লাখের স্থলে লিখলেন ৫০ লাখ

সরল বিশ্বাসে দিলেন সাদা চেক, ৫ লাখের স্থলে লিখলেন ৫০ লাখ

সই করা একটি সাদা চেকে ৫ লাখ টাকার স্থলে ৫০ লাখ টাকা বসিয়ে মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী একটি পরিবার। ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের আরাপপুরে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সম্পর্কের সূত্র ধরে লেনদেন হয় মেয়ের পিতা ও মেয়ের শ্বশুরের মধ্যে কিন্তু মাত্র ৫ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে মেয়ের বাবা সই করা একটি সাদা চেক দেন বেয়াই মঞ্জুর হাসান মাসুদকে। সম্পর্কের টানাপোড়েনে সেই সাদা চেকটায় আজ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির পরিবারের। পরিবারের অভিযোগ- বিশেষ প্রয়োজনে ৪ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা তার মেয়ের শ্বশুরের থেকে নিলেও সে সময় তাকে দিয়েছিলেন সই করা একটি সাদা চেক। পরবর্তীতে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধও করা হয়েছে সেই টাকা! তারপরও সই করা সাদা চেকে ৫০ লাখ টাকার বিশাল অঙ্ক বসিয়ে মামলা করেন মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

এ ছাড়াও যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহের মঞ্জুর হাসান মাসুদের পুত্র মো. অর্নব ইবনে হাসানের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই তিনি আরেকটি বিয়ে করেছেন এবং প্রথম স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সময় রেখে দেওয়া হয় তার গহনা, স্কুল পাসের মূল সার্টিফিকেট, পাসপোর্টসহ ব্যবহারিক জিনিসপত্র। এমনকি ২য় বিয়ে করার সময় স্ত্রীর গলায় যে স্বর্ণের হার পরিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটাও প্রথম স্ত্রীর বলে দাবি করেন প্রথম স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে।

ভুক্তভোগী নারীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট ঝিনাইদহের আরাপপুরের বাসিন্দা মো. মঞ্জুর হাসান মাসুদের ছেলে মো. অর্নব ইবনে হাসানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় ওই নারীর। ওই নারী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের জিবনা গ্রামের মহিউদ্দীন বকুলের কন্যা। মোটর গাড়ির ব্যবসার সুবাদে স্ত্রী ও পরিবারসহ ঢাকাতে বসবাস করতেন অর্নব ইবনে হাসান। বিবাহের কয়েকদিন পরে স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে ভারতেও যান তিনি। বিবাহের দুই মাস পর অন্তঃসত্ত্বা হন ওই গৃহবধূ। তারপর থেকেই যৌতুকের টাকার দাবি করে আসছিলেন অর্নব ইবনে হাসান ও তার পিতা মঞ্জুর হাসান মাসুদ। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন ওই গৃহবধূ।

ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূ জানান, আমাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পরে আমরা একমাস ভালো ছিলাম। আমার হানিমুনেও গেছিলাম ভারতে। সেখান থেকে ফিরে আসার পরে আমার স্বামী ও শ্বশুরের আচরণ পাল্টে যেতে থাকে। তারা সবসময় আমাকে নানানভাবে হেনস্তা ও নির্যাতন করত টাকার জন্য। আমার পরিবারের সাধ্য অনুযায়ী বেশ কয়েকবার স্বামী ও শ্বশুরকে টাকাও দিয়েছে আমার পরিবার। পরে আমার স্বামী হাসান ও শ্বশুর মঞ্জুর হাসান মাসুদের চাহিদা বাড়তে থাকে। একসময়ে আমার পরিবার টাকা দিতে না পারায় আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে আমার শ্বশুর, শাশুড়ি ও তার ছেলে। আমাকে কয়েকবার তারা হত্যারও চেষ্টা করেছে। আমাকে হত্যার জন্য আমার গলায় লাইলনের দড়ি পেঁচিয়ে বাথরুমের হ্যাঙ্গারের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সেখান থেকে আমাকে পাশের বাসার লোকজন ও বাসার গাড়িচালক উদ্ধার করে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ভর্তি করেন। এই ঘটনার পরে তারা আমার বাবাকে ঢাকাতে খবর দিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে আমার বাবাকে ও আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করে একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নিয়ে আমার বিবাহের সমস্ত জিনিসপত্র, স্বর্ণালংকার রেখে দিয়ে আমাকে তাদের বাসা থেকে বের করে দেয়। তারপর থেকে তারা আমার আর কোনো খোঁজখবর রাখে নাই। আমার পরিবার থেকে অনেক চেষ্টা করেছে আমাদের সংসারটি ঠিক করার জন্য কিন্তু তাদের পরিবার থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তারপরে আমার একটি কন্যাসন্তান হয়েছে, তাকেও তারা কোনোদিন দেখতে আসেনি। পরে জানতে পারি আমার স্বামী অর্নব হাসান আমাকে তালাক দিয়েছে এবং আমাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করে নেওয়া একটি সাদা স্ট্যাম্প ও অন্য স্ট্যাম্প ভেন্ডর থেকে ক্রয়কৃত দুটি আলাদা স্ট্যাম্পে আমার স্বাক্ষর জাল করে আমার স্বামীর সঙ্গে সংসার না করার অঙ্গীকারনামা তৈরি করেছে। পরবর্তীতে আমরা চুয়াডাঙ্গা কোর্টে একটি স্ট্যাম্প জালিয়াতির মামলা করি। সেই মামলা এখন বিচারাধীন আছে। কোর্ট আমার স্বাক্ষর ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে, সেখানে স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

ওই গৃহবধূর বাবা মহিউদ্দীন বকুল বলেন, আমার মেয়েকে ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট পারিবারিক বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ে দেওয়ার সময় আমাদের পক্ষ থেকে কোনো কিছু দেওয়ার কথা না থাকলেও আমরা আমাদের সাধ্যমতো জিনিসপত্র দিয়েছিলাম। যাতে, বিয়ের পরে আমার মেয়ে সেখানে ভালো থাকে। মেয়ের বিয়ের সময় আমি অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে মেয়ের বিয়ের ঘটক মো. সেলিম মঞ্জুর হাসান মাসুদের কাছ থেকে আমাকে ৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা নিয়ে দেয়। টাকার পরিবর্তে আমি তাদের সরল বিশ্বাসে একটি সাদা চেক দেই। পরে তাদেরকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ১২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে মোট ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। যার সমস্ত প্রমাণাদি আমাদের কাছে আছে। কিন্তু বিয়ের এক মাস পর থেকেই তাদের সুর বদলাতে থাকে। তারা আমাদের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ দিতে থাকে টাকার জন্য এবং আমার মেয়েকে নানাভাবে অত্যাচার নির্যাতন করতে থাকে। পরে যৌতুকের টাকা দিতে না পারায়, তারা আমাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে আমার মেয়েকে এক কাপড়ে আমার সঙ্গে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত তারা আমার মেয়ের কোনো খোঁজখবর রাখেনি। এ বিষয়ে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দেখি আমার দেওয়া চেকে তারা ৫০ লাখ টাকা লিখে আমার বিরুদ্ধে উল্টো কোর্টে মামলা দিয়েছেন। আমি তাদের কাছ থেকে ব্যবসার কাজের জন্য ৭৮ লাখ টাকা নিয়েছি এমন একটি স্ট্যাম্পে আমার স্বাক্ষর জাল করে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারনামা তৈরি করেছে। সেখানে তারা উল্লেখ করেছে আমি ৭৮ লাখ টাকার মধ্যে ২৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি, বাকি ৫০ লাখ টাকাও পরিশোধ করব। অথচ তাদের আমি কোনো টাকা দেইনি। তারা যে আমার কাছ থেকে ২৮ লাখ টাকা নিয়েছেন তার কোনো ডকুমেন্টস তাদের কাছে নেই বা আমি তাদেরকে কীভাবে ২৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি তা আমি নিজেই জানি না। তারা তাদের অপকর্মের শাস্তির ভয়ে আমাদের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা ও বানোয়াট কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে ওই নারীর শ্বশুর মঞ্জুর হাসান মাসুদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মহিউদ্দিন বকুলের মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিবাহ দিয়েছিলাম। পরে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বৈবাহিক কালীন সময়ে মহিউদ্দিন বকুল আমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ৭৮ লাখ টাকা ধার নেন। ৭৮ লাখ টাকার মধ্যে নগদ ৫ লাখ দিয়েছেন, একটি গাড়ি বাবদ ২৩ লাখ টাকা দিয়েছেন। বাকি ৫০ লাখ টাকার জন্য আমাকে একটি চেক দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়। বর্তমানে এ বিষয়টি নিয়ে কোর্টে মামলা চলমান রয়েছে।

স্ট্যাম্প জালিয়াতির মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি সঠিক নয়। স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত হয় নাই। এ বিষয়ে আমরা আদালতে বলেছি, এই স্বাক্ষরটি পুনরায় ফরেনসিকের জন্য। তবে মঞ্জুর হাসান মাসুদ তার বিয়াই বকুলকে এত বিশাল অঙ্কের টাকা কবে কীভাবে দিয়েছিলেন জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কী বলে নুরের ওপর হামলা করা হয়, জানালেন ইয়ামিন মোল্লা

আফগানদের হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে শুভ সূচনা পাকিস্তানের

নুরের ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতি

আইসিইউতে নুর, ৪৮ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাবে না : চিকিৎসক

নুরের ওপর হামলা ‘অত্যন্ত ন্যক্কারজনক’: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব

নুরের ওপর হামলায় ১০১ সংগঠনের বিবৃতি

নুরকে দেখতে এসে আসিফ নজরুল অবরুদ্ধ 

আহত নুরকে দেখতে ঢামেকে প্রেস সচিব

সহিংসতার ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিবৃতি

সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি : হাসনাত

১০

মাদুশঙ্কার হ্যাটট্রিকে লঙ্কানদের রুদ্ধশ্বাস জয়

১১

নুরের ওপর হামলার কড়া প্রতিবাদ ছাত্রদলের

১২

ভারতীয় বক্সারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হাসান শিকদার

১৩

আসিফ নজরুলকে তুলোধুনো করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

১৪

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিল গণঅধিকার পরিষদ

১৫

ইংল্যান্ড সফরের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণা

১৬

নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী নেদারল্যান্ডস কোচ

১৭

‘মার্চ টু জাতীয় পার্টি অফিস’ ঘোষণা

১৮

‘নুরের ওপর হামলা পক্ষান্তরে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর হামলা’

১৯

লজ্জাবতী বানরের প্রধান খাদ্য জিগার গাছের আঠা!

২০
X