

প্রতি বছর ১২ জুন পালিত হয় ‘শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস’। দিবসটির মূল লক্ষ্য শিশুদের শোষণমুক্ত শৈশব নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি। তবে বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশে শিশুশ্রম হ্রাসের বদলে আবারও বাড়ছে। আর উদ্বেগজনকভাবে দেশের সর্বোচ্চ শিশুশ্রমপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে রাজশাহী বিভাগ।
একসময় শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী আজ শিশুশ্রমের ভয়াবহ বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনায়। যে বয়সে শিশুদের স্কুলে থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সরেজমিন এবং গবেষণার জরিপে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
বইয়ের বদলে গ্যারেজে জীবন
সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রাজশাহী নগরের খড়খড়ি বাইপাস এলাকার একটি মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপে হাতে গ্রিস মেখে ব্যস্ত ১০ বছর বয়সী মুন্না। সমবয়সীরা যখন স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সে একটি মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন খুলতে ব্যস্ত। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করে তার আয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। সেই টাকাতেই চলে সংসারের বাজার, কেনা হয় ছোট ভাইয়ের ওষুধ।
মুন্না কালবেলাকে বলেন, ‘আমার বাবা নাই। মা হোটেলে কাজ করে। মাদারীগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে এসে ভাড়া বাসায় থাকি। কাজ না করলে খাওয়া চলবে না।’ মুন্নার মতো হাজারো শিশুর শৈশব আজ শ্রমের ভারে নুয়ে পড়েছে রাজশাহীতে।
দেশের সর্বোচ্চ শিশুশ্রম রাজশাহীতে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে শিশুশ্রমের হার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় গড় ৯ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় এই হার অনেক বেশি।
মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)-২০২৫ অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের প্রতি আটজন শিশুর মধ্যে একজন কোনো না কোনো ধরনের শ্রমে নিয়োজিত।
গবেষকরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য, মৌসুমি দারিদ্র্য, শিক্ষাঝরে পড়া এবং পারিবারিক আয় সংকট এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
১ লাখ ৪০ হাজার শিশুশ্রমিক
জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগেই রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশুশ্রমিক।
সংখ্যার দিক থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকার পর রাজশাহীর অবস্থান শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে শিশুশ্রমের হার সবচেয়ে বেশি এ বিভাগেই। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব শিশুর বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ওয়েল্ডিং, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, গ্যাস বার্নার, কৃষিশ্রম, টেইলারিং, ইটভাটা, ক্ষুদ্র শিল্প ও অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন খাতে শিশুদের উপস্থিতি স্পষ্ট।
কেন বাড়ছে শিশুশ্রম?
শিশু অধিকারকর্মী ও গবেষকদের মতে, রাজশাহীতে শিশুশ্রম বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে—
দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্য: উত্তরাঞ্চলের বহু পরিবার মৌসুমি কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। আয় কমে গেলে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
শিক্ষাঝরে পড়া: দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছানোর আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করে। এরপর তাদের বড় অংশ শ্রমে যুক্ত হয়।
অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার: গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ, কৃষি, টেইলারিং ও মৌসুমি ব্যবসায় শিশু নিয়োগ সহজ এবং তদারকি কম।
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা: অনেক পরিবার শিশুর কাজকে ‘কাজ শেখা’ বা ‘সহায়তা’ হিসেবে দেখে। ফলে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল।
কৃষিখাতেও বাড়ছে শিশুশ্রম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি খাতে শিশুশ্রম বৃদ্ধির পেছনে পরিবারের আয়, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং অভিভাবকদের আর্থসামাজিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গবেষণায় দেখা যায়, অধ্যয়নরত এলাকায় কৃষিশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৯০.৮০ শতাংশই ছেলে এবং ৯.২০ শতাংশ মেয়ে দারিদ্র্য ও পারিবারিক প্রয়োজনের কারণে তারা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছে, যা শ্রম আইন ও শিশু অধিকার সুরক্ষার নীতিমালার পরিপন্থী।
ছয় বছরে বেড়েছে ১২ লাখ শিশুশ্রমিক
বিবিএস ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ছয় বছরে প্রায় ১২ লাখ নতুন শিশু শ্রমে যুক্ত হয়েছে। এই বৃদ্ধির বড় অংশ দেখা গেছে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে।
আইন আছে, বাস্তবায়ন দুর্বল
রাজশাহী বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক আলমগীর কুমকুম কালবেলাকে বলেন, শিশুশ্রম সংক্রান্ত বিষয় সরাসরি আমরা পরিচালনা করি না। এগুলো কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর দেখে থাকে।
রাজশাহী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম কালবেলাকে জানান, শিশুশ্রম নিরোধে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১০০ শিশুকে নিয়ে কাজ করছি এবং তাদের পরিবারের জন্য সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৪ বছরের নিচের শিশুকে আমরা শিশু হিসেবে বিবেচনা করি। তবে ১৮ বছরের নিচে অনেক কিশোর জীবিকার তাগিদে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুশ্রম রোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন।
মেধা হারাচ্ছে রাজশাহী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক আক্তার হোসেন মজুমদার কালবেলাকে জানান, শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে শিশুশ্রমের হার বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। শিশুশ্রমের কারণে মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের প্রতি বিনিয়োগ না করলে দেশ কখনোই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন করতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক শিশু হতাশায় মাদক, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
কী করণীয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহী বিভাগে শিশুশ্রম কমাতে আলাদা আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা জরুরি। তারা যে সুপারিশগুলো দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য উপবৃত্তি বৃদ্ধি ২. মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা ৩. স্কুলভিত্তিক পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি চালু করা ৪. দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ৫. আয়বর্ধক কর্মসূচি ও ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ বৃদ্ধি ৬. ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান ৭. ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশু নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ৮. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন ৯. বিদ্যালয় ত্যাগকারী শিশুদের ডাটাবেজ তৈরি
হারানো শৈশব কি ফিরবে?
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ইএলও) বলছে, শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে এমন যেকোনো কাজই শিশুশ্রম। বাংলাদেশ শ্রম আইনেও ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ এবং ১৮ বছরের নিচের কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া বেআইনি।
তবু বাস্তবতা হলো, রাজশাহীর হাজারো শিশু এখনও কর্মশালা, গ্যারেজ, কৃষিক্ষেত্র ও ইটভাটায় শ্রম দিচ্ছে।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে তাই প্রশ্ন একটাই—আগামী বছরও কি রাজশাহীর এসব শিশু শ্রমিক হিসেবেই পরিসংখ্যানে গণনা হবে, নাকি তারা ফিরে পাবে তাদের প্রাপ্য শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্ন দেখার অধিকার?