

খাবার নিয়ে ছড়ানো গুজবগুলোর মধ্যে প্লাস্টিক চালের কথা খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন ভিডিও দেখা যায়, যেখানে চাল নাকি লাফায়, আগুনে ধরলে গলে যায় বা পানিতে ভেসে ওঠে।
যেসব দেশে প্রতিদিন চাল খাওয়া হয়, সেখানে এই ধরনের দাবি মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত করে তোলে। প্রশ্ন হলো, প্লাস্টিক চাল কি সত্যিই আছে, নাকি এটি শুধুই গুজব? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘরের চাল আসল কি না, তা বোঝার উপায় কী।
২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে প্লাস্টিক চাল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেক সময় এসব গুজব ভেজাল খাবারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে জানায়, সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি চাল বিক্রির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে কিছু ক্ষেত্রে ভেজালের ঘটনা ঘটেছে। যেমন পশুখাদ্যের জন্য নিম্নমানের চালের সঙ্গে কৃত্রিম উপাদান মেশানো বা চাল চকচকে দেখানোর জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে। এসব কাজ অবৈধ ও ক্ষতিকর হলেও, পুরো চালকে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করার সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। বাস্তবে ব্যাপকভাবে প্লাস্টিক চাল তৈরি ও বিক্রির ধারণার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।
চালের কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনেক সময় সন্দেহের জন্ম দেয়। রান্না করা চাল ঠান্ডা হলে এর মধ্যে থাকা শর্করা শক্ত হয়ে যেতে পারে, ফলে পড়ে গেলে সামান্য লাফানোর মতো মনে হয়। কিছু চাল প্রাকৃতিকভাবেই চকচকে বা আধা স্বচ্ছ হয়।
বেশি পালিশ করা সাদা চাল দেখতে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল লাগতে পারে। আবার আগুনে ধরলে যেকোনো প্রাকৃতিক খাবারই পুড়ে বা গলে যাওয়ার মতো আচরণ করতে পারে, যা অনেকের কাছে প্লাস্টিকের মতো মনে হয়।
এই বিষয়গুলো ছোট ভিডিওতে কেটে দেখানো হলে, প্রেক্ষাপট ছাড়া তা সহজেই ভয় ছড়ায়।
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। ভাইরাল অনেক পরীক্ষাই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
পানিতে ভাসানোর পরীক্ষা : কিছু চাল ভাসে, কিছু ডুবে যায়। চালের জাত, বয়স ও দানার ভেতরের বাতাসের ওপর এটি নির্ভর করে। শুধু ভাসলেই চাল নকল বলা যায় না।
আগুনে পোড়ানোর পরীক্ষা : আগুনে ধরলে চাল কালচে হয়ে পোড়া গন্ধ দেয়। এটি স্বাভাবিক। অনেক সময় পোড়া শর্করা শক্ত হয়ে গেলে মানুষ একে প্লাস্টিক ভেবে ভুল করে।
চাপ দিয়ে ভাঙার পরীক্ষা : কাঁচা চাল স্বাভাবিকভাবেই শক্ত। সহজে গুঁড়া না হলেই সেটিকে সন্দেহজনক বলা ঠিক নয়।
এই ধরনের ঘরোয়া পরীক্ষা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না। চালের উপাদান নিশ্চিতভাবে জানতে হলে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা প্রয়োজন।
ভাইরাল কৌশলের পেছনে না ছুটে দৈনন্দিন কিছু বিষয় খেয়াল করাই বেশি কার্যকর।
প্যাকেট ও উৎস যাচাই করুন
বিশ্বস্ত দোকান বা পরিচিত বিক্রেতার কাছ থেকে চাল কিনুন। প্যাকেটজাত চাল হলে উৎপাদনের তারিখ, ব্যাচ নম্বর ও খাদ্য নিরাপত্তার তথ্য দেখুন। উৎস জানা নেই এমন খোলা চাল এড়িয়ে চলুন।
চালের দানা দেখুন
একই জাতের চালের দানা সাধারণত একই রকম হয়। অতিরিক্ত গুঁড়া, অস্বাভাবিক আবরণ বা বাজে গন্ধ থাকলে তা ভালো লক্ষণ নয়।
গন্ধ নিন
তাজা চালে হালকা, স্বাভাবিক গন্ধ থাকে। টক, রাসায়নিক বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ হলে সেটি ব্যবহার করা ঠিক নয়।
রান্নার আগে ধুয়ে নিন
চাল ধোয়ার সময় পানি ঘোলা হওয়া স্বাভাবিক। এতে উপরের ময়লা, ধুলো ও অতিরিক্ত পালিশ উঠে যায়।
অল্প করে রান্না করে দেখুন
চাল যদি অনেকক্ষণ রান্নার পরও শক্ত থাকে, অদ্ভুত রঙ ছাড়ে বা অস্বাভাবিক গন্ধ দেয়, তাহলে তা না খাওয়াই ভালো।
প্রতিদিনের বাজারে প্লাস্টিক চাল ছড়িয়ে পড়ার ধারণাটি মূলত গুজব, যা ভয় ও ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এর মানে এই নয় যে খাদ্যে ভেজাল নেই, তবে ভেজাল সাধারণত আরও সূক্ষ্ম ও সস্তা পদ্ধতিতে করা হয়, প্লাস্টিক দিয়ে পুরো চাল বানিয়ে নয়। সচেতনভাবে কেনাকাটা, চালের গন্ধ ও গঠন লক্ষ্য করা এবং রান্নার সময় স্বাভাবিক আচরণ বোঝাই সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা।
হাজার বছর ধরে চাল মানুষকে খাবার জুগিয়ে আসছে। একটু সচেতন থাকলে ভয় না পেয়ে নিশ্চিন্তে চাল খাওয়া সম্ভব।
সূত্র : Times of India
মন্তব্য করুন