আব্দুল জব্বার তপু
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৯:৫২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

নারী ও মা

আব্দুল জব্বার তপু। ছবি : সৌজন্য
আব্দুল জব্বার তপু। ছবি : সৌজন্য

সপ্তাহ তিনেক আগে অফিস থেকে তিন দিন ছুটি নিয়েছিলাম। শুক্র-শনিবারসহ যেটা হয়েছিলো পাঁচ দিন। উদ্দেশ্য ছিল ছেলেটার সাথে ভালো সময় কাটানোর পাশাপাশি একটা এক বছর প্লাস বাচ্চাকে লালন-পালন করতে কতটুকু সময়, শ্রম দিতে হয় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয় তার বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া। আমার ছুটির তিন দিন বাবুকে ডে কেয়ারে না পাঠিয়ে আমার কাছেই রাখি। উল্লেখ্য, আমাদের ছেলের বয়স ১৫ মাস। সে অফিসের ডে কেয়ারে থাকে। তার সারাদিনের খাবার আমরা দিই। আমি বাসায় থাকলে অফিসের দিনে আমাদের ছেলের খাবার সাধারণত আমি রান্না করি। আর আমার স্ত্রী বাবুকে প্রস্তুত করার কাজটা করে। রান্নার ক্ষেত্রে ১/১.৫ ঘণ্টা লাগে।

মূলত সবজি সিদ্ধ করে সেটা মাছ বা মাংসের সঙ্গে কিমা করা লাগে। মাছ হলে খুব সময় নিয়ে কাঁটা বেছে দিতে হয়। অফিসের দিনসহ সব দিনই বাসায় থাকলে বাবুর গোসল করানো, কাপড় পরানো, প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করা সব কাজই আমরা ভাগাভাগি করি। কিন্তু সব কাজ একা করা কম হয়। তাই সেই ছুটিতে সুযোগটা নিয়েছিলাম। আরও উল্লেখ্য, আমার বাসায় আমার ছোট বোন ও ভাই থাকে তাই যে কোনো প্রয়োজনে বলার আগেই ওরা হাজির থাকে। এই ৫ দিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

অভিজ্ঞতায় আসি।

এই পাঁচ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাচ্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আরামদায়ক কাজটা হলো ওর জন্য খাবার রান্নাসহ উপরে উল্লেখিত কাজগুলো। আর সবচেয়ে কঠিন হলো বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো। এর বাইরে একটি আরও একটি কঠিন কাজ হলো বাচ্চার মন-মর্জি বুঝে ওর সঙ্গে সময় কাটানো। ও যতক্ষণ জেগে থাকে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখা। কারণ বাবু হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করতে পারে, খাট থেকে বা সোফা থেকে ওঠানামা করে, গাড়ি নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, বিভিন্ন জিনিসপত্র ফালায়, সেখানে কাচের কোনো জিনিস আছে কিনা চেক করতে হয়, বিভিন্ন জায়গায় মুখ দেয়। তার মানে হলো ঘুম বাদে তার জন্য সারাদিনই বরাদ্দ রাখতে হয়। কাজটা প্রচণ্ড ধৈর্যের। এক পলকে এদিক উদিক হলে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কারণ, বাসার ফ্লোর টাইলস করা, খাট কাঠের, আসবাবপত্র কাছের, বাসনগুলো কাচ ও সিরামিক্সের। পড়ে গেলে ব্যথা পাবে, হাত-পা ভাঙবে, কেটেকুটে যাবে। এ ভয়গুলো সবসময়ই থাকে।

পাঁচ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এটা পাগল হতে হয়। বিরতিহীন আপনাকে চলাফেরা করতে হয়, সব কাজ করতে হয় বাচ্চাটাকে চোখে রেখে। এর বাইরে ব্রেস্ট ফিড করানোর কোনো সুযোগ তো আমার নেই। সেই অভিজ্ঞতা আমার কখনই হবে না। আমার স্ত্রীর মারফত যতটুকু জানি, ব্রেস্ট ফিড করার সময় ও পরে ওকে যতটুকু অবজার্ভ করি তাতে ব্রেস্ট ফিড করানোর পর একজন মা প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়। তার বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয়, যা অধিকাংশ সময়ই পারে না। একটু সুযোগ পেলেই তাই ঝিমায়।

এই কথাগুলো কেন বলছি?

আমাদের বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে রাখার জন্য আমরা ৩২০০ টাকা দিই। অফিসের ডে-কেয়ার, তাই অনেক সাবসিটি আছে। এই মানের একটা ডে-কেয়ারে ঢাকার অন্য যে কোনোটাতে রাখতে হলে আমাকে ১৫-২০ হাজার টাকা দিতে হতো। খোঁজ নিয়েই বলছি। বাচ্চাটা ডে-কেয়ারে থাকে দিনের মাত্র ৮ ঘণ্টা, বাকি সময় মায়ের প্রযত্নে। যে মা চাকরি করে না তার কাছে তো ২৪ ঘণ্টাই।

কতটুকু মূল্যায়ন করি আমরা এই মাকে?

অর্থের কথা তো বাদই দিলাম- পারিবারিক, সামাজিক বা মানসিক মূল্যায়নই কতটুকু করি? বাচ্চার রোগ হলে মায়ের দোষ- মা ঠিকমতো যত্ন নেয় না। কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হলে মায়ের দোষ- মা খেয়াল রাখে না, মা সন্তানের প্রতি উদাসীন, দিনের বেলায় বিছানায় শরীরটা নিলেই সারাদিন ঘুমায়-ঝিমায়। রান্না বা খাবার দিতে দেরি হলেই সংসারে মনযোগী নাসহ নানা ধরনের কথা শুনতে হয় শ্বশুর-শাশুড়িসহ স্বয়ং নিজের বরের কাছে। দুজনই অফিস থেকে এসেছে। ছেলেটা ফ্রেস হয়ে টিভি রিমোর্ট হাতে আর মেয়েটা সোজা রান্নাঘরে। ছেলেটা সর্বোচ্চ বাচ্চাটাকে নিয়ে বসছে। বাচ্চাটা পায়খানা করছে। মেয়েটাকে চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে বাচ্চাটাকে পরিষ্কার করে দিয়ে আবার রান্নাঘরে। আর গৃহিণী হলে তো কথায়ই নেই। বাচ্চা শুধু চুমু খাওয়ার জন্য। নাথিং এলস।

এতো গেল বাসার অবস্থা। একটু অফিসে আসি। অফিসের অধিকাংশ সিনিয়রের আশা হলো, তার অধীনের একই পদের ছেলে-মেয়ে হোক বিবাহিত-অবিবাহিত, বাচ্চার মা-বাচ্চা ছাড়া মেয়ে সবাই একই রকম কাজ করবে, একই সময়ে কাজ জমা দিবে, একজন মেয়ে মা হওয়ার আগে যেরকম কাজে চটপটে ছিল মা হওয়ার পরও সেটা অব্যাহত রাখবে, দিন-রাত কাজ করবে, ই-মেইল যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট করে রিপ্লাই দেবে, প্রমোশন-ইংক্রিমেন্টের জন্য নিজেকে আরও বেশি কর্মঠ (শারীরিক ও বুদ্ধিভিত্তিক) হিসেবে উপস্থাপন করবে, যখন যেখানে যেতে বলবো যাবে, ছুটি-ছাটার কথা কম বলবে।

সিনিয়ররা হয়তো ঠিক আছে। পেশাগত জায়গা। এটাই তো চাইবে। কিন্তু উপরের যে কাজগুলোর কথা বললাম সেগুলো করে বসদের এসব আকাঙ্ক্ষা সময়মতো পূরণ করা কোনো মায়ের পক্ষে কি সম্ভব? মানুষ তো ভাই, মেশিন না। একজন মাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করবেন না?

১০ বছরের পেশাগত জীবনে নিজের অফিসসহ আমার নেটওয়ার্কের বহু মাকে দেখেছি চাকরি ছেড়ে দিতে। অথচ তাদের কর্মদক্ষতা ও সম্ভাবনা আমাদের অনেকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। যে মেয়েটা একটা অফিসে ৪/৫ বছর গাধার মতো কাজ করল সে মেয়েটাকে আপনি ২/৩টা বছর একটু সমর্থন দিবেন না? এটাতে সমর্থন না, এটা ওর প্রাপ্য। আজ বিশ্বের সব মেয়ে যদি বলে মা হবো না তাহলে তো আগামী ৫০ বছর পর দুনিয়া জনশূন্য হয়ে যাবে। আপনারা সেটা চান? আবার কিছু ক্ষেত্রে অফিসের বসরা একটু নমনীয় হলেও নিজের আত্মমর্যাদাবোধ থেকেও কাউকে কাউকে চাকরি ছেড়ে দিতে দেখেছি।

আরেক দল বলে, মেয়েদের চাকরি করার কি দরকার?

অথচ এরাই যখন বৌকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যায় তখন নারী ডাক্তার খোঁজে। এ দেশে শিক্ষা ও চিকিৎসায় নারী অবদান কত তা কি এরা জানে? খালি আলগা আলাপ ভণ্ডের দল।

যার যোগ্যতা ও প্রয়োজন আছে সে চাকরি করলে সমস্যা কি? কোন ধর্ম না করেছে? মাথাব্যথা তো মাথা কেটে ফেল। আরে ভাই মাথাব্যথার সঠিক কারণটা জানার চেষ্টা করো, কিভাবে মাথাব্যথা ঠিক করা যায় সেটা চিন্তা করো। না, মাথা কেটে ফেলো।

কোন সাহায্য-সহযোগিতা লাগবে না। পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কার কি প্রাপ্য সেটা জানুন। যার যেটা প্রাপ্য তাকে সেটা দিন- তাহলেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানব সমাজ এগিয়ে যাবে।

ভালো কাজের মূল্যায়ন নারী-পুরুষ একইভাবে করুন, খারাপ কাজের সমালোচনাটাও নারী-পুরুষের একইভাবে করুন। কারও প্রতি কোনো করুণা করার প্রয়োজন হবে না। তখন এ রকম নারী-পুরুষ নিয়ে আলাদা করে লিখতেও হবে না, নারী দিবসের দরকার হবে।

মায়েদের বলছি, আমাদের ক্ষমা করবেন, হতাশ হবেন না, এপারে না পেলেও উপরওয়ালা আপনাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। ওপারে আপনাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন হবে বলে বিশ্বাস রাখবেন। এই লেখাটি মায়েদের জন্য। দুনিয়ার সব মাকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখক : আব্দুল জব্বার তপু

গবেষক, ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যে কারণে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী

এনসিপি নেত্রী নীলিমা দোলার পদত্যাগ

যেসব লক্ষণে বুঝবেন কেউ গোপনে আপনাকে ভালোবাসে

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক চুক্তির কফিনে শেষ পেরেক

তারা আমাদের দমাতে পারবে না : ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী

কে এই নিকোলাস মাদুরো?

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পরিকল্পনা জানালেন সিনেটর

বিশ্বকাপজয়ী পেসার শাহীন আলমের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ালেন তারেক রহমান

ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘রহস্যময়’ তথ্য জানালেন জুমা

মাদুরোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাল যুক্তরাষ্ট্র

১০

হান্নান মাসউদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা

১১

প্রথমবার জুটি বাঁধছেন অক্ষয়-রানি, আসছে ‘ওএমজি ৩’-এর তৃতীয় কিস্তি

১২

সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে মামলার হুঁশিয়ারি তৌসিফের

১৩

মাদুরোকে আটকের খবর জানেন না ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রমাণ দাবি

১৪

ভেনেজুয়েলার সব সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ

১৫

বাদ পড়া মুস্তাফিজ কী পাবেন নিলামের পুরো টাকা, যা আছে নিয়মে

১৬

ভিক্টর ক্লাসিক বাসে নারীকে ধর্ষণের হুমকি, আটক ২

১৭

খালেদা জিয়ার আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মোরশেদ মিল্টন

১৮

ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী রবিনের মনোনয়ন বৈধ

১৯

এই মার্চে ভোগান্তিতে ফেলবে কিউলেক্স মশা

২০
X