

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর পর প্রশ্ন উঠেছে, কেন হামলাগুলো মূলত দেশটির দক্ষিণাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে? ইরানের সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে তেহরানের শক্তিশালী প্রতিরোধ সক্ষমতা, সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সামরিক পরিকল্পনা।
বুধবার (১৫ জুলাই) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্ত ভঙ্গ করে আবারও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। তবে এটি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার অংশ নয়, বরং বহু বছর ধরে প্রস্তুত করা একটি সামরিক কৌশলের বাস্তবায়ন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে ইরানের সেনাবাহিনী, আইআরজিসি, নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, ড্রোন ইউনিট এবং অন্যান্য সহায়ক বাহিনী একটি অভিন্ন কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রতিপক্ষকে আর আলাদা আলাদা বাহিনীর মুখোমুখি হতে হচ্ছে না; বরং একটি সমন্বিত সামরিক শক্তির মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এতে দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, নজরদারি ড্রোন এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা চক্র তৈরি করেছে। ইরানি বিশ্লেষকদের মতে, শত্রুপক্ষ যদি একটি প্রতিরক্ষা স্তর অতিক্রমও করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী স্তরের মুখোমুখি হতে হয়। এই সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই ইরানের প্রতিরোধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সাম্প্রতিক পদক্ষেপকেও বিশ্লেষকরা কেবল সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, এটি প্রতিপক্ষকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কোনো বিভাজন নেই এবং দেশের সামরিক সক্ষমতা একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির মুখপাত্রদের যৌথ বৈঠকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে মেহের নিউজের বিশ্লেষণে। সেখানে গণমাধ্যমে সমন্বিত বার্তা প্রেরণ এবং যৌথ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে আইআরজিসির প্রতি সমর্থন জানায়।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ভবিষ্যতে সামরিক কর্মকাণ্ড, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দুই বাহিনীর মধ্যে আরও সমন্বয় বাড়ানো হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কার্যক্রমও যৌথভাবে পরিচালনা করা হবে। অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন, ইসলাম, বিপ্লব এবং দেশের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই ইরানের সব সশস্ত্র বাহিনী ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং শত্রুপক্ষের প্রচারণা মোকাবিলায় এই ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের পরিকল্পনা যে নতুন নয়, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রহিম সাফাভির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রায় দেড় দশক আগে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশে হরমুজ প্রণালি বন্ধের একটি বিস্তারিত সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল।
তার তথ্য অনুযায়ী, তখনকার আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। পরে সেটি সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদনের পর সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ইরানি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধের পদক্ষেপ দেশটির প্রতিরোধ সক্ষমতার বাস্তব প্রকাশ। তাদের যুক্তি, প্রতিরোধ তখনই কার্যকর হয় যখন প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে, হামলার সম্ভাব্য লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে। আর এই উপলব্ধি তৈরি করতেই সামরিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশের সামরিক হুমকি কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেখিয়েছে, প্রয়োজন হলে ঘোষিত হুমকি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা তার রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের কৌশলগত হিসাবও বদলে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মেহের নিউজের প্রতিবেদনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যদি যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ সমঝোতা ভেঙে আবার হামলা চালিয়েই থাকে, তাহলে তারা কেন তেহরান বা দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছে না?
ইরানি বিশ্লেষকদের উত্তর, যুক্তরাষ্ট্র জানে সংঘাতের পরিধি বাড়ালে তারা এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, যেখান থেকে সহজে বের হওয়া সম্ভব হবে না। তাই তারা আপাতত দক্ষিণাঞ্চলে সীমিত হামলার কৌশল নিয়েছে এবং বৃহত্তর সামরিক সংঘর্ষ এড়িয়ে চলছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক দুই দফা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন থেমে যায়নি। বরং দেশীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে নতুন সামরিক সক্ষমতা তৈরির কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সমন্বিত সামরিক কাঠামো এখন এমন এক প্রতিরোধ দেয়াল তৈরি করেছে, যা প্রতিপক্ষকে কৌশল বদলাতে বাধ্য করছে। তাদের দাবি, যখন প্রতিপক্ষ উপলব্ধি করে যে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয় অর্জন সম্ভব নয়, তখন সংঘাতের পরিবর্তে পিছু হটা ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প তার সামনে থাকে না।