দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে কৃষি খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এজন্য কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে একাধিক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সেটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কৃষিঋণ বিতরণে কয়েকটি ব্যাংকের অনীহা দৃশ্যমান হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরের ৭ মাস পার হলেও বেসরকারি খাতের ৮ ব্যাংক ২০ শতাংশ ঋণও বিতরণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে দুটি ব্যাংক কোনো ধরনের ঋণ বিতরণই করেনি। এ দুটি ব্যাংক হচ্ছে বেসরকারি খাতের সিটিজেন ব্যাংক ও বিদেশি উরি ব্যাংক। আর পদ্মা ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে লক্ষ্যমাত্রার শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ ছাড়া মধুমতি ব্যাংক ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১২ দশমিক ৭৭, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৪ দশমিক ৫৫, সীমান্ত ব্যাংক ১৭ দশমিক ৭২ ও সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ঋণ বিতরণ হার দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ।
অবশ্য এ দৌড়ে কিছু ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। যেখানে পাঁচটি ব্যাংক এই সময়ের মধ্যে লক্ষমাত্রার শতভাগ ঋণ বিতরণে সক্ষম হয়েছে। যাদের কেউ কেউ ১৫০ শতাংশেরও বেশি ঋণ বিতরণের সক্ষমতা দেখিয়েছে। এর মধ্যে শতাংশের হারে সবচেয়ে বেশি কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে বিদেশি হাবিব ব্যাংক। ব্যাংকটি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে বিতরণ করেছে ২২২ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া এবি ব্যাংক ১৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংক ১৪৫ দশমিক ৩, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ১২১ দশমিক ৮ এবং ব্যাংক আল ফালাহ বিতরণ করেছে ১০৫ দশমিক ৩ শতাংশ ঋণ।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ২১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো, যা লক্ষ্যমাত্রার ৬০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার ৬০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সে হিসাবে ২ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ বাড়লেও শতাংশের হারে কিছুটা কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন আট ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ৭ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৬২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো এ সময় ১৩ হাজার ৬০৩ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশ। আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে বেশি ঋণ বিতরণ করলেও বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ বিতরণ করছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোও এনজিও লিঙ্কেজের মাধ্যমে বর্তমানে ঋণ বিতরণ করছে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, অর্থবছরের ৭ মাসে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ আগের বছরের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে ২০ হাজার ৩১০ কোটি টাকা আদায় করেছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।
কম সুদে কৃষকদের হাতে ঋণ পৌঁছাতে এবার ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থার (এমএফআই) ওপর বেসরকারি ব্যাংকের নির্ভরশীলতা আরও কমিয়ে আনা হচ্ছে। আর এজন্য ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ৫০ শতাংশ কৃষিঋণ বিতরণ বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা এত দিন ছিল ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া কৃষিঋণের কত অংশ কোন খাতে দিতে হবে, তা-ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কৃষিনীতিতে মোট কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রার কমপক্ষে ৬০ শতাংশ শস্য ও ফসল খাতে, ১৩ শতাংশ মৎস্য খাতে এবং ১৫ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাতে এবং বাকি অর্থ অন্যান্য খাতে বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে শস্য উৎপাদন খাতে। যার পরিমাণ ৯ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এর পরই রয়েছে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি উৎপাদন খাতে ৫ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে রয়েছে মৎস্য উৎপাদন খাত। এ খাতে বিতরণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৯ কোটি টাকা।