

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে তুলে নিয়ে গেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো অভ্যাস, যার মাধ্যমে তারা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে মার্কিন ইচ্ছার কাছে নত করতে বাধ্য করে।
মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সেই বিতর্কিত পররাষ্ট্রনীতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় সরকার উৎখাত করে নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। মাদুরোর পতনের মাধ্যমে সেই পুরোনো ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতিই নতুন করে ফিরে এলো বলে মনে করছেন অনেকে।
এই নীতির ইতিহাস শুরু ১৮৯৮ সালে। সে বছর কিউবার বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটায়। এরপর থেকে ওয়াশিংটন অন্তত ৪০টি লাতিন আমেরিকান সরকারের পতনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে। তবে এসব হস্তক্ষেপের সবক’টিই যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে, তা নয়।
আফগানিস্তান ও ইরাকের শিক্ষা: একবিংশ শতাব্দীতে এসে যুক্তরাষ্ট্র এই নীতি লাতিন আমেরিকার গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ায় প্রয়োগ করে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও সেখানে স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
আফগানিস্তানে ২০০১ সালে তালেবান সরকারকে উৎখাত করা হয়, কারণ তারা আল-কায়েদা নেতা ও ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় ২০ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে যুদ্ধের পর তালেবান আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে।
ইরাকে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ২০১১ সালে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু দেশটি তখনো দুর্নীতি, সহিংসতা, মার্কিনবিরোধী বিদ্রোহ এবং ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস: এই ব্যর্থতার ইতিহাস সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ফল ভিন্ন হবে। মাদুরোকে আটক করার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকাল সরাসরি ভেনেজুয়েলার শাসনভার হাতে রাখবে এবং পরে একটি ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণ’ ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা দেশটি চালাব। আমরা ঝুঁকি নিতে পারি না যে, এমন কেউ ক্ষমতায় আসবে, যে জনগণের ভালো চায় না।’
কেন ভেনেজুয়েলা আলাদা: কিছু বিশ্লেষকের মতে, ভেনেজুয়েলার সামাজিক বাস্তবতা আফগানিস্তান বা ইরাকের চেয়ে আলাদা। দেশটিতে তীব্র জাতিগত বা ধর্মীয় বিভাজন নেই, যা আগের মার্কিন দখলদারিত্বগুলোতে বড় ধরনের প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল।
মাদুরো ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রয়াত নেতা হুগো শাভেজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বামপন্থি জনতাবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। শাভেজ ১৯৯৯ সালে নির্বাচিত হয়ে ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর থেকেই মাদুরো রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছিলেন।
সহিংসতার আশঙ্কা: তবে সবাই ট্রাম্পের আশাবাদে একমত নন। ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সতর্ক করে বলেছে, মাদুরো-পরবর্তী সময়ে দেশটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর একটি অংশ নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারে এবং গেরিলা যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
এ ছাড়া দেশজুড়ে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্ষমতার শূন্যতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুরোনো ভুল এড়ানোর চেষ্টা: ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর বাথ পার্টির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সরকারি চাকরি থেকে বাদ দেওয়াকে একটি বড় ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তাকেও নতুন ব্যবস্থায় যুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে এক বিচারকের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিরোধীদের হতাশা: মাদুরোর দীর্ঘদিনের বিরোধীরা আশা করেছিলেন, নতুন সরকারে তারাই নেতৃত্ব দেবেন। বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো মার্কিন হস্তক্ষেপকে ‘স্বাধীনতার মুহূর্ত’ বলে স্বাগত জানালেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকে নেতৃত্বের জন্য অযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, মাচাদো গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
নরিয়েগার পুনরাবৃত্তি: অনেকে মনে করছেন, মাদুরোর পরিণতি হতে পারে পানামার সাবেক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগার মতো। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর নরিয়েগাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে মাদক পাচারের অভিযোগে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মাদুরোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন ও অস্ত্র পাচারের।
আঞ্চলিক প্রভাব
মাদুরোর পতন কিউবা ও নিকারাগুয়ার মতো তার মিত্র দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করতে পারে। কিউবা দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নিকারাগুয়ায় একসময় মার্কিন সমর্থিত বিদ্রোহীদের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের চেষ্টা হয়েছিল, যার স্মৃতি এখনো তাজা।
আইনি চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা: মাদুরোর গ্রেপ্তার ও বিচার নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠলেও বিশ্লেষকদের মতে, তা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে বড় বাধা হবে না। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি বলেছেন, মাদুরোকে ‘আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকার আদালতেই’ বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
ভেনেজুয়েলায় এই হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে, না কি আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করবে—সে প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়ই।
মন্তব্য করুন