

ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাত করার পর যুক্তরাষ্ট্র যে পথ বেছে নিয়েছে, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একদিকে যেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তেমনি বিপজ্জনকও বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ পদক্ষেপকে ইরাকের মতো পূর্ণমাত্রার ‘রেজিম চেঞ্জ’ বলা না গেলেও এটি কার্যত একটি ‘নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি’, যার মাধ্যমে মাদুরোর রেখে যাওয়া ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোকে চাপে রেখে যুক্তরাষ্ট্র নিজের শর্ত চাপিয়ে দিতে চায়।
হোয়াইট হাউসের লক্ষ্য স্পষ্ট—ভেনেজুয়েলাকে এমন একটি অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করা, যা ট্রাম্পের কল্পিত ‘মাগা-প্রভাবিত’ পশ্চিম গোলার্ধের অংশ হবে।
মাদুরোকে নাটকীয় এক বিশেষ অভিযানে বিছানা থেকে তুলে নিউইয়র্কে এনে আদালতে হাজির করার পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব চলে গেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে। রোববার রাতে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই এখন কার্যত ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘কে দায়িত্বে আছে, সেটা জিজ্ঞেস করবেন না। উত্তরটা বিতর্কিত হবে। এর মানে হলো—আমরাই দায়িত্বে।’
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এভাবে নিজের দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার মাইল দূরের একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের দাবি করা বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কঠোর ও প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়। এই আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ট্রাম্প একই সঙ্গে কলম্বিয়াকে ‘খুব অসুস্থ’ এবং মেক্সিকোকে ‘নিজেদের ঠিক করতে হবে’ বলে মন্তব্য করেন।
কম খরচে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা
ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, মাদুরোর শাসনের অবশিষ্ট অংশকে নিজেদের পক্ষে টেনে আনলে আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো ব্যয়বহুল যুদ্ধ এড়ানো যাবে। তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র অপ্রত্যাশিতভাবে ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—যা দেশটির জনগণের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কংগ্রেসে ক্ষোভ, রিপাবলিকানদের সমর্থন
মাদুরো উৎখাতে কংগ্রেসের অনুমোদন না নেওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, এটি কার্যত যুদ্ধের শামিল। তবে রিপাবলিকানরা এখনো ট্রাম্পের পাশে শক্তভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। তবু এই নতুন সামরিক অভিযান ট্রাম্পের নিজস্ব মাগা শিবিরে বিভাজন সৃষ্টি করবে কি না, তা জানতে সময় লাগবে।
নীতির লক্ষ্য কী
হোয়াইট হাউস এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কারাকাসে একটি স্থিতিশীল কর্তৃত্ব বজায় রাখা। প্রশাসন চাইছে না ইরাকের মতো শুদ্ধি অভিযান বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের একযোগে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকার ভেঙে পড়ুক। কারণ তাতে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শনিবার ট্রাম্প যখন বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’, তখনই একুশ শতকের সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এসব তুলনাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তেল নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখবে, যাতে ভেনেজুয়েলার নতুন নেতৃত্ব ট্রাম্পের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়।
রুবিও বলেন, ‘আমরা চাই মাদক পাচার বন্ধ হোক, গ্যাং সদস্যদের আসা বন্ধ হোক এবং ইরান ও কিউবার প্রভাব শেষ হোক। ভেনেজুয়েলার তেল জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হোক, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের নয়।’
চাপে রেখে ‘চুক্তি’ আদায়
ওয়াশিংটনের আশা, ডেলসি রদ্রিগেজ বা অন্য কোনো ক্ষমতাসীন ব্যক্তি মাদুরোর মতো অনমনীয় না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসবেন। তবে বাস্তবে বিষয়টি সহজ নয়। রদ্রিগেজ প্রকাশ্যে মাদুরোর উৎখাতের সমালোচনা করলেও রোববার রাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সহযোগিতার কর্মসূচি’ প্রস্তাব করেন। কিন্তু ট্রাম্প একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নির্দেশ না মানলে রদ্রিগেজকে ‘মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে’।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, নৌবহর, বিশেষ বাহিনী বা বিমান হামলার হুমকি দিয়ে কি সত্যিই একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
ন্যাটোর সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইভো ডালডার বলেন, ‘যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনের মতো সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে না। এই ফারাক একসময় বড় বিপদ ডেকে আনবে।’
গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে সরে আসা
এই সংকটের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে যাওয়া। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে কার্যত বাতিল করে দেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি ভালো মানুষ; কিন্তু দেশে তার যথেষ্ট সমর্থন বা সম্মান নেই।’
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলেছিল, বিরোধী প্রার্থী এডমুন্দো গণসালেসই প্রকৃত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট; কিন্তু মাদুরো সরানোর পরও তাকে ক্ষমতায় বসানোর কোনো ইঙ্গিত নেই।
রুবিও স্বীকার করেন, এটি বাস্তবতার প্রশ্ন। তার ভাষায়, ’১৫-১৬ বছর ধরে একটি শাসনব্যবস্থা চলেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন আশা করা অবাস্তব।’
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল চান, চান পুরো পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য; কিন্তু মাদুরোর রেখে যাওয়া শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই দমন-পীড়নের অংশীদার হয়ে উঠছে কি না—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন অভিযানের পরিণতি ইরাক ও আফগানিস্তানের পুনরাবৃত্তি হবে, না কি ট্রাম্পের কৌশলগত সাফল্য—তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
মন্তব্য করুন